নবীজির সা. আখলাক।

প্রিয় ভাই, শুধু মানুষের উপরের সৌন্দর্য দেখে পাগল হয়ো না। মাকালফল দেখতে খুব সুন্দর হলেও ভেতরটা অত সুন্দর নয়। মনে রেখো, মানুষের সৌন্দর্য দু’প্রকার। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ সৌন্দর্যকে حسن صورة বলে। আর পরোক্ষ সৌন্দর্যকে حسن سيرت বলে। এক কথায় শারিরিক সৌন্দর্য এবং চারিত্রিক সৌন্দর্য। যার বডি সুন্দর কিন্তু ভেতর নোংড়া তার এ সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই। আর যে লোকটি শারিরিকভাবে কালো কিন্তু ভেতরটা আলোকিত সে লোকের মূল্য মানুষের কাছে অপরিসীম। এক কথায় চেহারার সৌন্দর্যের চেয়ে চারিত্রিক সৌন্দর্যের মূল্য লক্ষ গুন বেশি।হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবীজি সা. বলেছেন,

 أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا

অর্থ: তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলিম হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি।
সূত্র: জামে তিরমিযি হাদিস: ১১৬২

প্রিয়, তুমি যাকে মডেল হিসাবে গ্রহণ করেছো, সে নায়ক-নায়িকা উপরে ফিটফাট হলেও তার আভ্যন্তরিন অবস্থা সম্পর্কে তুমি কি অবগত নও? কিছুদিন পরপর তাদের এক্স ভিডিও বের হয়, স্ক্যান্ডেল দিয়ে অনলাইন ভরা থাকে। উপরে ফিটফাট হলেও তাদের ভেতরটা সদরঘাট। এরপরও তুমি তারই পদাঙ্কের অনুসারী। অথচ আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. যত সুন্দর উপরে ছিলেন, ভেতরটা আরও কোটিগুণ বেশি সুন্দর ছিল। প্রশ্ন করবে, বুঝলাম কিভাবে? হ্যাঁ, সেটাই শোনো। এটা বুঝতে একটি কথা জানতে হবে, এ পৃথিবীতে কে কতটুকু ভালো বা চারিত্রিকভাবে কে সেরা এটা শিওর হতে তার স্ত্রীর কাছে জানতে চাও। কারণ কোনো মহিলা তার স্বামীর কাছে মুরিদ হয় না। কারণ স্বামীর চরিত্র সম্পর্কে সবচে বেশি জানে তার স্ত্রী। আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. এ কথাটি কিন্তু ১৪ শ বছর আগেই বলে গেছেন।হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, নবীজি সা. বলেছেন,

وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ خُلُقًا

অর্থ: যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম তারাই তোমাদের মধ্যে অতি উত্তম।
সূত্র: জামে তিরমিযি হাদিস: ১১৬২ আত তারগীব ওয়াত তারগীব খ: ৩ পৃ: ৯৫

স্ত্রীর কাছে নবীজি সা.

পৃথিবীর সবার কাছে আপনি ভাল হলেও স্ত্রীর কাছে বুযুর্গ হতে পারবেন না। সবাই আপনার বাছে মুরিদ হলেও স্ত্রী মুরিদ হয় না। কথিত আছে, এক বুুযুর্গ রাতে আকাশ দিয়ে উড়ছিলেন, রাতে স্ত্রী উড়ন্ত বুযুর্গকে দেখে সকালে স্বামীকে বললেন, জানেন, রাতে অনেক বড় একজন বুযুর্গ দেখেছিলাম আকাশে উড়তে।
স্বামী বললেন, সেজন তো তোমার স্বামী তথা আমিই ছিলাম। স্ত্রী বললেন, ও,, এজন্য পা টা একটু বাকাবাকা দেখেছিলাম।

বুঝাতে চাচ্ছি, স্ত্রীর কাছে স্বামী কখনও বুযুর্গ হয় না। যদি কোনো স্ত্রী স্বামীর ব্যাপারে ভাল কমেন্ট করে, তাহলে বুঝতে হবে লোকটি আসলে ভাল। এজন্য নবীজি সা. বলেন,

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهْلِهِ وَأَنَا خَيْرُكُمْ لأَهْلِي

অর্থাৎ তোমাদের মাঝে সে-ই ভাল যে তার পরিবারের নিকট ভাল। আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের চাইতে উত্তম।
সূত্র: জামে তিরমিযি হাদিস: ৩৮৯৫

স্ত্রীর মুখে নবীজি সা.

হ্যাঁ, এখন তুমি প্রশ্ন করতে পারো, নিজে দাবি করা কোনো প্রমাণ নয়। সো, অন্য কোনো প্রমাণ থাকলে পেশ করুন। আচ্ছা, চলো। সে হাদিসটিও তোমাকে শুনিয়ে দিই, কি বলেছেন আমার মডেল মুহাম্মাদ সা.! এর স্ত্রী। তাঁকে নবীজি সা. এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব দেন,

كان خُلُقُه القُرآنَ

অর্থাৎ নবীজির সা. চরিত্র ছিল আল কুরআন।
সূত্র: মুসনাদে আহমাদ হাদিস: ২৫৮১৩ তহাবী: ৪৪৩৫

স্ত্রীর সাথে নবীজির ব্যবহার

আসওয়াদ (রাযি.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ‘আয়িশাহ্ (রাযি.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন,

قَالَتْ كَانَ يَكُونُ فِي مِهْنَةِ أَهْلِهِ تَعْنِي خِدْمَةَ أَهْلِهِ

অর্থ: তিনি বললেন, ঘরের কাজ-কর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ পরিবারবর্গের সহায়তা করতেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৬৭৬

হযরত আয়েশাকে রা. জিজ্ঞেস করা হলো,, রাসুল সা. ঘরে কী করতেন? তিনি বললেন,

كان يَخيطُ ثَوبَه ويَخصِفُ نَعلَه قالَتْ وكان يَعملُ ما يَعمَلُ الرِّجالُ في بُيوتِهم

অর্থ: নবীজি নিজ হাতে জামা সেলাই করতেন জুতা সেলাই করতেন এবং তোমাদের মতো তিনি ঘরের যাবতীয় কাজ নিজ হাতে করতেন।
সূত্র: মুসনাদে আহমাদ হাদিস: ২৬২৩৯

স্ত্রীদেরকে কখনও মারেননি

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ مَا ضَرَبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم شَيْئًا قَطُّ بِيَدِهِ وَلاَ امْرَأَةً وَلاَ خَادِمًا إِلاَّ أَنْ يُجَاهِدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَىْءٌ قَطُّ فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ إِلاَّ أَنْ يُنْتَهَكَ شَىْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ

অর্থ: আয়িশাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বহস্তে কোন দিন কাউকে আঘাত করেননি, কোন নারীকেও না, খাদিমকেও না, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত। আর যে তার অনিষ্ট করেছে তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন।
সূত্র: সহীহ মুসলিম হাদিস: ২৩২৮

নবীজির সা. চরিত্রের উপর নাস্তিকদের অভিযোগ ও জবাব

অভিযোগসমূহ:

বর্তমান সময়ে নাস্তিকরা নবীজি সা. এর উপর চারিত্রিক কলঙ্ক লাগাতে বেশ তৎপর। তারা বেশ কিছু অভিযোগ করে থাকেন নবীজি সা. এর চরিত্রের উপর। নিন্মের সংক্ষেপে আলোচনা করলাম।

১. নারীলোভী।

তাদের প্রথম দাবি হলো, নবী মুহাম্মাদ সা. যদি নারী লোভী না হতেন, তাহলে (১১টা) বহু বিবাহ কেন করলেন?

জবাব:

. নবীজি সা. কাউকে জোরদবস্তি বিবাহ করেননি, বরং কেউ কেউ তো সরাসরি নিজে এসে নবীজির সামনে পেশ করেছেন। আবার নবীজি সা. এর কাছে মেয়ের বাবা নিজে এসে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে নবীজি সা. কে বিবাহ করতে অনুরোধ করেছেন। এর দ্বারা বুঝা গেল, সবাই সেচ্ছায় নবীজি সা. কে গ্রহণ করেছেন। আর আমরা জানি নাস্তিকদের কাছে বিবাহ বহির্ভূত উভয়সম্মতির ফিজিক্যাল রিলেশন বৈধ এবং এটা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা। তাহলে ব্যক্তিস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে পুরুষ-মহিলার সম্মতিতে ব্যাভিচার যদি নাস্তিকদের কাছে বৈধ হয়, তাহলে নবীজি সা. ও তাঁর স্ত্রীগণ তো উভয় সম্মতিক্রমে বিয়ে করেছেন, সেটাও তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতা। তাঁদের এ ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাস্তিকদের জন্য নিজেদের রুলস সম্পর্কে মূর্খতার পরিচয় নয় কি?

. নবীজি সা. যাঁদেরকে বিবাহ করেছিলেন, তাঁরা কেউ কেউ কেউ ছিলেন গোত্রপ্রধানের মেয়ে। ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য গোত্রপ্রধানদের মেয়েদের বিবাহের প্রস্তাব ফিরিয়ে না দিয়ে, বরং গ্রহণ করে তাদের সাথে সম্পর্ক গভীর করা একজন বিচক্ষণ ব্যক্তির পরিচয় বটে। পাশাপাশি তাঁদের ভেতর কেউ কেউ ছিলেন বিধবা। এ বিধবাদের অসহায়ত্ব জিবনের আশ্রয় দেয়া এবং তাঁদের চাওয়া শরয়ীভাবে পুরণ করা এবং তাদের পূর্ণ অধিকার দেওয়া নাস্তিকদের কাছেও একজন দয়াবান মানুষের পরিচয়।

৩. নবীজি সা. এর বহু বিবাহ নাস্তিকদের কাছেও নৈতিক হিসাবে স্বীকৃত। কারণ নাস্তিকদের গুরু হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন,

“কোন পুরুষ যদি একাধিক নারীর সাথে বিবাহ বা অবিবাহিত জীবন-যাপন করতে চায়। তারা সবাই যদি তাতে সুখী হয়, তাতে কারো আপত্তি থাকা উচিত নয়। তাদের জীবনযাপন অন্য কাউকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না, সুখী করে তাদের; তাইতো অনৈতিক নয়। মানুষ ক্রমশ সে দিকে এগোচ্ছে, বর্তমানে অনৈতিক নৈতিকতা বেশিদিন তাদের বাধা দিয়ে তাদের আটকে রাখতে পারবে না। একজন সমাজ থেকে উঠে যাবে কাম ও অধিকারভিত্তিক বিবাহ, পরিবার ও নৈতিকতা।”
সূত্র: আমার অবিশ্বাস লেখক: হুমায়ুন আজাদ।

হুমায়ুন আজাদ এ কথা দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন, অবৈধ সম্পর্ক বৈধ হওয়ার জন্য শুধু উভয়ের সম্মতিই যথেষ্ট। তাহলে নবীজি সা. এর বিবাহ কেন নৈতিক নয়? কেননা নবীজি সা. এর সকল সহধর্মিণী নবীজির সাথে সুখে ছিলেন। যা হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

সকল সহধর্মিণী নবীজির সাথে সুখে ছিলেন।

হযরত আয়েশা রা. বলেন,

لَمَّا أُمِرَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم بِتَخْيِيْرِ أَزْوَاجِهِ بَدَأَ بِيْ فَقَالَ إِنِّيْ ذَاكِرٌ لَكِ أَمْرًا فَلَا عَلَيْكِ أَنْ لَا تَعْجَلِيْ حَتَّى تَسْتَأْمِرِيْ أَبَوَيْكِ قَالَتْ وَقَدْ عَلِمَ أَنَّ أَبَوَيَّ لَمْ يَكُوْنَا يَأْمُرَانِيْ بِفِرَاقِهِ قَالَتْ ثُمَّ قَالَ إِنَّ اللهَ جَلَّ ثَنَاؤُهُ قَالَ (وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللهَ وَرَسُوْلَه” وَالدَّارَ الْاٰخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيْمًا) قَالَتْ فَقُلْتُ فَفِيْ أَيِّ هَذَا أَسْتَأْمِرُ أَبَوَيَّ فَإِنِّيْ أُرِيْدُ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَالدَّارَ الآخِرَةَ قَالَتْ ثُمَّ فَعَلَ أَزْوَاجُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم مِثْلَ مَا فَعَلْتُ

অর্থ: যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর সহধর্মিণীদের ব্যাপারে দু’টি পন্থার একটি পন্থা বেছে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হল, তখন তিনি প্রথমে আমাকে বললেন, তোমাকে একটি বিষয় সম্পর্কে বলব। তাড়াহুড়ো না করে তুমি তোমার আব্বা ও আম্মার সঙ্গে পরামর্শ করে নিবে। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তিনি অবশ্যই জানতেন, আমার আব্বা-আম্মা তাঁর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলবেন না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এরপর তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেনঃ

وَإِنْ كُنْتُنَّ تُرِدْنَ اللهَ وَرَسُوْلَه” وَالدَّارَ الْاٰخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنٰتِ مِنْكُنَّ أَجْرًا عَظِيْمًا

‘‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার ভূষণ কামনা কর…..মহা প্রতিদান পর্যন্ত। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এ ব্যাপারে আমার আব্বা-আম্মার সঙ্গে পরামর্শের কী আছে? আমি তো আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের জীবন কামনা করি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যান্য সহধর্মিণী আমার মতই জবাব দিলেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৭৮৬

সুতরাং নবীজির বিবাহের উপর প্রশ্ন তুলে তাঁর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করার তীন চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে এবং হবে।

. আগে একটি রিপোর্ট দেখে নেয়া যাক।

“গত ১৩ মার্চে লন্ডন ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, পৃথিবীর সব থেকে বড় পরিবার প্রধান হলেন জিওনা চানা। তার ৩৯ জন স্ত্রী রয়েছেন। এছাড়াও ৯৪ জন সন্তান, ১৪ জন পুত্রবধূ এবং ৩৩ জন নাতি-নাতনি রয়েছে।”
সূত্র: কালের কণ্ঠ অনলাইন ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ঈ:

উক্ত নিউজটিকে কত সুন্দরভাবে মিডিয়ায় প্রকাশ করা হলো। পুরো বিশ্বজুড়ে তাকে অভিনন্দন জানানো হলো, তার বাড়িটি পর্যটনকেন্দ্র বানানো হলো, তার ব্যাপারে কিন্তু কোনো নাস্তিক সমালোচনা করেননি। কারণ এটা নাকি তার ব্যক্তিস্বাধীনতা। তাহলে ৩৯ জন স্ত্রীর অধিকারী “জিওনা চানা”র বিষয়টি যদি ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে, তাহলে মুহাম্মাদ সা. এর চরিত্র নিয়ে এত টানাটানি কেন? তিনি কি অবৈধ কোনো সম্পর্ক করেছেন? তিনি যা করেছেন, বৈধভাবে। সুতরাং তাঁর চরিত্রে হস্তক্ষেপ করতে চাইলে, তারাই একদিন নিঃবংশ হয়ে যাবে।

৫. নবীজি সা. যদি নারীলোভী হতেন, তাহলে খাদিজাতুল কুবরা রা. কে নিয়ে এত বছর সংসার করলেন কেন? অথচ খাদিজা রা. ও নবীজি সা. এর বয়সে ব্যাপক তফাৎ।

وقد تزوج النبي ﷺ أيضا خديجة وكانت أسن منه بخمسة عشرة سنة، عمرها أربعون وكان حين تزوجها عمره خمس وعشرون عليه الصلاة والسلام
و توفيت عن خمس و ستين سنة

অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আম্মাজান খাদিজা রা. কে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন খাদিজা রা. থেকে ১৫ বছরের ছোট অর্থাৎ আম্মাজান আয়েশা রা. এর বয়স তখন ছিল ৪০ বছর, আর নবীজির সা. বয়স ছিল ২৫ বছর। আর যখন আম্মাজান খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন, তখন আম্মাজান খাদিজার রা. বয়স ছিল ৬৫ বছর।
সূত্র: সিয়ারু আলামিন নুবালা খ: ২ পৃ: ১১১ সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ ওয়া আখবারুর খুলাফা ( ইবনে হিব্বান র.) খ:১ পৃ: ৬০ শারাফুল মুস্তাফা (আল্লামা আবু সাআদ) খ: ৩ পপৃ: ২৪৬ জামেউস সীরাতিন নাবাবিয়্যাহ খ: ২ পৃ: ২৬ দালায়েলুন নবুয়্যাহ (বায়হাকী) খ: ২ পৃ: ৭২ সীরাতে মুস্তাফা সা. (ইদ্রিস কান্ধলবী র.) খ: ৩ পৃ: ২৭৯

এই খাদিজা রা. জিবদ্দশায় নবীজি সা. কোনো মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখা তো দূরের কথা বিবাহতেও জড়াননি। হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

 لَمْ يَتَزَوَّجِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عَلَى خَدِيجَةَ حَتَّى مَاتَتْ

অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজাহ্ থাকাবস্থায় আর কোন বিয়ে করেননি, যতদিন না তিনি ইন্তিকাল করেন।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ২৪৩৬

প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন তো নবীজি সা. যদি নারীলোভী হতেন, তাহলে ১৫ বছরের বড় কোনো বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে পুরো যৌবন বয়সটা অর্থাৎ ২৫ বছর পর্যন্ত সংসার করতেন? এটা কেমন অযৌক্তিক প্রশ্ন!

২. নবী মুহাম্মাদ সা. টাকারলোভী ছিলেন

উপরোক্ত জবাবটা যখন আমরা প্রদান করি তখন তারা আরেকটি প্রশ্ন করে বসেন। প্রশ্নটি হলো, নবীজি সা. নারীলোভী না থাকলেও টাকার লোভী ছিলেন! আর এজন্যই যৌবনের চিন্তা বাদ দিয়ে টাকার চিন্তা করে বৃদ্ধ মহিলাকে নিয়ে সংসার করেছেন।

জবাব

নবীজি সা. টাকারলোভী হলে নিশ্চয় মক্কার বড়ধনী হতেন, কিন্তু এমনভাবে জিবন পরিচালনা করেছেন যে, অভাবের জন্য কখনও খাবার জোটেনি, কখনও ভাল একটা বিছানায় ঘুমাতে পারেননি। কয়েকটি প্রমাণ পেশ করছি।

১. নবীজির সা. পিঠে চাটাইয়ের দাগ।

ওমর রা. বলেন, একবার আমি নবীজি সা. এর কাছে গেলাম।

وَإِنَّهُ لَعَلَى حَصِيْرٍ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنَهُ شَيْءٌ وَتَحْتَ رَأْسِهِ وِسَادَةٌ مِنْ أَدَمٍ حَشْوُهَا لِيْفٌ وَإِنَّ عِنْدَ رِجْلَيْهِ قَرَظًا مَصْبُوْبًا وَعِنْدَ رَأْسِهِ أَهَبٌ مُعَلَّقَةٌ فَرَأَيْتُ أَثَرَ الْحَصِيْرِ فِيْ جَنْبِهِ فَبَكَيْتُ فَقَالَ مَا يُبْكِيْكَ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّ كِسْرَى وَقَيْصَرَ فِيْمَا هُمَا فِيْهِ وَأَنْتَ رَسُوْلُ اللهِ فَقَالَ أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ لَهُمْ الدُّنْيَا وَلَنَا الآخِرَةُ.

অর্থাৎ এ সময় তিনি একটা চাটাইয়ের উপর শুয়ে ছিলেন। চাটাই এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে আর কিছুই ছিল না। তাঁর মাথার নিচে ছিল খেজুরের ছালভর্তি চামড়ার একটি বালিশ এবং পায়ের কাছে ছিল সল্ম বৃক্ষের পাতার একটি স্তূপ ও মাথার উপর লটকানো ছিল চামড়ার একটি মশক। আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক পার্শ্বে চাটাইয়ের দাগ দেখে কেঁদে ফেললে তিনি বললেন, তুমি কেন কাঁদছ? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! কিসরা ও কায়সার পার্থিব ভোগ-বিলাসের মধ্যে ডুবে আছে, অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তারা দুনিয়া লাভ করুক, আর আমরা আখিরাত লাভ করি।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৯১৩

২. নবীজির সা. ঘরে রান্না।

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ لِعُرْوَةَ ابْنَ أُخْتِي إِنْ كُنَّا لَنَنْظُرُ إِلَى الْهِلاَلِ ثَلاَثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ وَمَا أُوقِدَتْ فِي أَبْيَاتِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَارٌ فَقُلْتُ مَا كَانَ يُعِيشُكُمْ قَالَتْ الأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ إِلاَّ أَنَّهُ قَدْ كَانَ لِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم جِيرَانٌ مِنْ الأَنْصَارِ كَانَ لَهُمْ مَنَائِحُ وَكَانُوا يَمْنَحُونَ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم مِنْ أَبْيَاتِهِمْ فَيَسْقِينَاهُ.

অর্থাৎ হযরত আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি একবার ‘উরওয়াহ (রাঃ)-কে বললেন, বোন পুত্র! আমরা দু’মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু (এর মধ্যে) আল্লাহর রাসূলের ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি বললাম, আপনারা কিভাবে দিনাতিপাত করতেন? তিনি বললেন, কালো দু’টি বস্ত্ত। খেজুর আর পানি। অবশ্য রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিছু আনসার প্রতিবেশীর কতকগুলো দুধেল প্রাণী ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তা দিত। আর আমরা তাই পান করতাম।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৬৪৫৯

৩. ক্ষুধার যন্ত্রনায় পেট বাঁধা

হযরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

جِئْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمًا فَوَجَدْتُهُ جَالِسًا مَعَ أَصْحَابِهِ يُحَدِّثُهُمْ وَقَدْ عَصَّبَ بَطْنَهُ بِعِصَابَةٍ – قَالَ أُسَامَةُ وَأَنَا أَشُكُّ – عَلَى حَجَرٍ فَقُلْتُ لِبَعْضِ أَصْحَابِهِ لِمَ عَصَّبَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بَطْنَهُ فَقَالُوا مِنَ الْجُوعِ

আমি একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে তাকে দেখলাম, তিনি সাহাবীদের সাথে বসে আলোচনায় রত আছেন এবং তিনি তার পেট একটি কাপড়ের টুকরো দিয়ে বেঁধে রেখেছেন। বর্ণনাকার উসামাহ্ বলেন, পাথরসহ ছিল কি-না, এতে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে। আমি তার কোন এক সাহাবীকে প্রশ্ন করলাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পেট কেন বেঁধে রেখেছেন? তারা বললেন, ক্ষুধার তাড়নায়।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ২০৪০

এমন একজন মহামানবের ব্যাপারে “টাকালোভী” শব্দটা কি মানায়? যারা এগুলো পড়ার পরও নবীজি সা. এর উপর “টাকালোভী” ট্যাগ লাগাতে চায়, তারা নিঃসন্দেহে তথ্যসন্ত্রাস।

নারী ও টাকার প্রলোভন ও নবীজির সা. জবাব:

১. উতবা ইবনে রবী’আ নবীজি সা. এর কাছে এসে কালেমার দাওয়াত বন্ধ করার জন্য প্রস্তাব পেশ করে বলল,

يا ابن أخي إن كنت إنما تريد بما جئت به من هذا الأمر مالا جمعنا لك من أموالنا حتى تكون أكثرنا مالا وإن كنت تريد به شرفا سودناك علينا حتى لا نقطع أمرا دونك وإن كنت تريد به ملكا ملكناك علينا

“হে ভাতিজা, যদি তোমার আনীত মিশন দ্বারা সম্পদের ফিকির থাকে, তাহলে বলো, আমরা তোমার জন্য আমাদের সম্পত্তি থেকে তোমার জন্য জমা করে (তোমাকে দিই), তুমি আমাদের ভেতর শ্রেষ্ট ধনি হয়ে যাবে। আর যদি তোমার ইচ্ছা থাকে সম্মান অর্জন করা, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানিয়ে দিই, তোমার কথা অমান্য করবো না। আর যদি বাদশা হওয়ার ইচ্ছা থাকে তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের বাদশাহ বানিয়ে দিই। আর যদি তোমার সাথে কোন জিনের আছর থাকে তাহলে আমরা তোমাকে ভাল চিকিৎসক দেখিয়ে ট্রিটমেন্ট করি, তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।

নবীজি সা. তাঁর কথা শেষ হওয়ার পর সুরা ফুসসিলাতের প্রথম কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করে তাকে শুনালেন।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ১ পৃ: ২৯৩

وإن كان إنما بك الباءة فاختر أي نساء قريش شئت فلنزوجك عشرا

অর্থাৎ আর যদি তোমার বিয়ে করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে কুরাইশী যেকোনো নারীদের ইচ্ছা পছন্দ করো, আমরা প্রয়োজনে ১০ টি বিয়ে করিয়ে দেবো।
সূত্র: আদ্দুররুল মানসুর খ: ১৩ পৃ: ৭৮

নবীজি সা. বললেন,

ما بي ما تقولون ما جئت بما جئتكم به أطلب أموالكم ولا الشرف فيكم ولا الملك عليكم ولكن الله بعثني إليكم رسولاً وأنزل علي كتاباً وأمرني أن أكون لكم بشيراً ونذيراً فبلغتكم رسالات ربي ونصحت لكم فإن تقبلوا مني ما جئتكم به ، فهــــو حظكم في الدنيا والآخرة وإن تردوه علي أصبر لأمر الله حتى يحكم الله بيني وبينكم

তোমরা যে জিনের আছরের কথা বলো, সেটা আমার সাথে নেই এবং আমার আনীত মিশনের দ্বারা তোমাদের থেকে সম্পদ, সম্মান এবং রাজত্বের আশা কিছুই নেই। তবে আল্লাহ আমাকে রাসুল বানিয়ে পাঠিয়েছেন, এবং তিনি আমার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং আমাকে আদেশ করেছেন যেন আমি তোমাদের জন্য সু-সংবাদ প্রদানকারী এবং সতর্ককারী হই। সেজন্য আমি আমার রবের রেসালতের প্রচার করেছি এবং তোমাদের উপদেশ দিয়েছি, যদি তোমরা আমার এই বিষয়টি গ্রহণ করো, তাহলে এটার প্রতিদান তোমরা দুনিয়া এবং আখেরাতের পাবে। আর যদি এটা আমার উপর ফিরিয়ে দাও, তাহলে আমার এবং তোমাদের মাঝে আল্লাহর ফায়সালা হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করব।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ১ পৃ: ২৯৬ হায়াতুস সাহাবা খ: ১ পৃ: ১০৩

২. অপরদিকে কুরাইশের নেতারা এসে নবীজির সা. চাচা আবু তালেবকে নবীজির সা. ব্যাপারে বিভিন্নভাবে দাওয়াতের কাজ বন্ধ করতে বলল। অন্যথায় যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে গেলে আবু তালেব নবীজিকে সা. বললেন, ভাতিজা, এগুলো থেকে বিরত থাকো,

لا تحملني من الأمر ما لا أطيق

আমার সাধ্যের বাহিরে কোন বিষয় আমার উপর চাপিয়ে দিও না। নবীজি সা. তখন বুঝলেন,

أنه قد ضعف عن نصرته والقيام معه

যে আবু তালেব নবীজিকে সা. সাহায্য করা এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে দুর্বলতা প্রকাশ করছেন। তখন নবীজি সা. তাঁর চাচা আবু তালেবকে বলেছিলেন,

 يا عم والله لو وضعوا الشمس في يميني والقمر في يساري على أن أترك هذا الأمر حتى يظهره الله أو أهلك فيه ما تركته

হে চাচা! আল্লাহর কসম, এরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে রাখে তবু একাজ থেকে আমি পিছু হটবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ এটাকে বিজয়ী করেন, কিংবা এ পথে আমি শেষ হয়ে যাই।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ১ পৃ: ২৬৬

৩. নয় বছরের আয়েশাকে কেন বিবাহ করলেন?

. তারা নবীজি সা. এর ৯ বছরের আয়েশা রা. কে বিবাহ করা নিয়ে মুখে ফেনা তুললেও তাদের কবিগুরু রবী ঠাকুরও কিন্তু এত অল্পবয়স্ক মেয়ে বিবাহ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্ম গ্রহণ করেন, ৭ মে ১৮৬১ সালে। পক্ষান্তরে তার স্ত্রী মৃণালিনী দেবী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৩ সালে। কিন্তু তারা উভয়ে বিবাহ করেন, ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বরে। তাহলে হিসাব করে দেখুন তো মৃণালিনী দেবীর বয়স কত ছিল? ৯/১০ বছর। অথচ এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন আজ পর্যন্ত তারা তোলেননি। প্রশ্ন শুধু মুহাম্মাদ সা. এর ব্যাপারে।

২. নাস্তিকদের ধর্মমতে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ে তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতায় যা খুশি করতে পারবে। তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। তাহলে চলুন আমরা দেখি আম্মাজান আয়েশা রা. কে নবীজি সা. যখন বিবাহ করেন, তখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন কি না। এ ক্ষেত্রে আম্মাজান আয়েশা রা. নিজেই বলেছেন,

أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم بَنَى بِهَا وَهِيَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ ‏.‏ وَقَدْ قَالَتْ عَائِشَةُ إِذَا بَلَغَتِ الْجَارِيَةُ تِسْعَ سِنِينَ فَهِيَ امْرَأَةٌ

অর্থ: হযরত আয়েশা রা. কে নিয়ে তার নয় বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাসর যাপন করেছেন। আয়েশা রা. বলেছেন, কোন বালিকা নয় বছরে পদার্পণ করলে সে মহিলা বলে গণ্য হবে।
সূত্র: জামে তিরিমিযি হাদিস: ১১০৯

তাহলে বুঝা গেল, আম্মাজান আয়েশা রা. ৯ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। আর প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মানুষের স্বাধীনতা নিয়ে হস্তক্ষেপ করা নাস্তিক ধর্মে অপরাধ।

৩. উপরন্তু নাস্তিকদের কাছে নৈতিকতার সংগা নাস্তিক হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন,

“নৈতিকতা সীমা হওয়া উচিত সংকীর্ণ; আমার কোন কাজ যেন অন্যের ক্ষতি না করে।”
সূত্র: আমার অবিশ্বাস পৃ: ১৪৩

তাহলে চলুন দেখি আম্মাজান আয়েশা রা. নবীজির সা. সাথে সংসার করা অবস্থায় কোনো ক্ষতি হয়েছিল কি না?

যখন আয়েশা রা. কে তাঁর ব্যক্তিগত জিবনে নবীজি সা. এর সাথে থাকা বা না থাকার বিষয়ে ইচ্ছাধিকার দিলেন, তখন খোদ আয়েশা রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সা.

فَفِيْ أَيِّ هَذَا أَسْتَأْمِرُ أَبَوَيَّ فَإِنِّيْ أُرِيْدُ اللهَ وَرَسُوْلَهُ وَالدَّارَ الآخِرَةَ

অর্থাৎ এ ব্যাপারে আমার আব্বা-আম্মার সঙ্গে পরামর্শের কী আছে? আমি তো আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের জীবন কামনা করি।”
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৭৮৬

বুঝা গেল আয়েশা রা. ৯ বছরে নবীজির সা. সংসারে এসে তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি। সুতরাং প্রমাণ হলো, নবীজি সা. ৯ বছরের আয়েশা রা. কে বিবাহ করে কোনো অনৈতিক কাজ করেননি। অতএব নবীজি সা. এর চরিত্রে কোনো কলঙ্ক লেপন করার কোনো সুযোগ নেই।

অভিযোগ

এত বয়সের ব্যবধানে কেন বিবাহ করলেন?

. নাস্তিকদের আরেক মান্যবর লেখক, হুমায়ুন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন, ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮ সালে, অন্যদিকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন জন্মগ্রহণ করেন ১২ অক্টোবর ১৯৮১ সালে। তাদের বিয়ের সময় হুমায়ূন আহমেদের বয়স ছিল ৫৭ আর শাওনের ২৪ বছর৷ ফলাফল: ৩৩ বছরের ছোট। এ ক্ষেত্রে কি নাস্তিকরা কখনও কলম চালিয়েছেন?

. নবীজি সা. কে কেন আয়েশা রা. বয়স কম হওয়া সত্ত্বেও গ্রহণ করলেন, সেটা তাঁদের উভয়ের ব্যক্তিস্বাধীনতা। সেক্ষেত্রে কারো হস্তক্ষেপ করে অনধিকারচর্চা করা মহাঅপরাধ।

৩. তৎকালীন আরবে অল্পবয়সী মেয়েকে বিয়ে করা সমাজে কোন দৃষ্টিকটু বিষয় ছিল না।

. নবীজি সা. আয়েশা রা. কে জোরদবস্তি করেও রাখেননি। বরং আয়েশা রা. কে ইচ্ছাধিকার দেয়ার পরও তিনি নবীজি সা. কে ছেড়ে চলে যাননি, বরং খুশিমনে নবীজির সা. সাথেই সংসার করেছেন। সুতরাং তাঁদের ব্যক্তিগত জিবন নিয়ে সমালোচনা করার দায়িত্ব তো নাস্তিকদের দেয়া হয়নি। এটা তাদের নিয়মেরও বহির্ভূত গর্হিত কাজ।

গোলামদের সাথে নবীজির আখলাক

ক. যায়েদ ইবনে হারেসা রা.।

যায়েদ রা. তখন ছোট। মায়ের সাথে নানার বাড়ি ঘুরতে গেলেন। ইতিমধ্যে তাঁর নানার শত্রুরা নানার পরিবারের উপর হামলা করে কিছু বন্ধি করে নিয়ে গেল। যাদের ভেতর যায়েদও রা. ছিলেন। অত:পর যায়েদ রা. কে গোলাম বানিয়ে বাজারে বিক্রি করার জন্য তোলা হলে

فاشتراه حكيم بن حزام لعمته خديجة بأربعمائة درهم

হাকিম ইবনে হিযাম রা. তাঁর ফুফু হযরত খাদিজার রা. এর জন্য চারশো দিরহামের বিনিময় ক্রয় করে তাঁকে হাদিয়া স্বরুপ পেশ করলেন।

فلما تزوجها رسول الله صلى الله عليه وسلم وهبتْه له

নবীজি সা. যখন খাদিজা রা. কে বিবাহ করলেন, তখন যায়েদ রা. কে হযরত খাদিজা রা. নবীজি সা. কে হাদিয়া হিসাবে পেশ করলেন।

وكان أبوه حارثة قد جزع عليه جزعاً شديداً وبكى عليه حين فقده

এদিকে যায়েদ রা. এর বাবা (সন্তান হারিয়ে) অত্যান্ত ব্যাথিত হ্নদয়ে কাঁদতে কাঁদতে চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এক সময় হজ্বের মৌসুমে তাঁর গোত্রের কিছু লোক হজ্ব করতে এসে যায়েদ রা. কে দেখে চিনে ফেললেন এবং তিনিও তাদের দেখে চিনে ফেললেন। অত:পর যায়েদ রা. বললেন, আমার পরিবারকে আমার বিষয় অবগত করো। তারা ফিরে গিয়ে তাঁর বাবাার কাছে বিষয়টি খুলে বলল এবং তাঁর বর্তমান অবস্থানের বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে জানিয়ে দিলে

فخرج حارثة وكعب أخوه بفدائه

তাঁর বাবা হারেসা এবং চাচা কা’ব মুক্তিপন নিয়ে বের হলেন। মাক্কায় এসে নবীজি সা. এর অবস্থানের স্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে বলা হলো, তিনি মসজিদে আছেন। তারা সেখানে গিয়ে নবীজি সা. কে বললেন,

يا ابن عبد المطلب يا ابن سيد قومه أنتم أهل حَرَم الله تفكون العاني وتطعمون الأسير جئناك في ولدنا عبدك، فامنن علينا وأحسن في فدائه فإنا سندفع لك

হে আব্দুল মুত্তালিবের সন্তান, হে কওমের নেতার সন্তান, আপনারা আল্লাহর পবিত্র ভূমির অধিবাসী।আপনারা স্বয়ং কয়েদীদের মুক্ত করেন, ক্ষুধার্ত কয়েদীদের খাদ্য দান করেন। আমরা আমাদের ছেলের তালাশে আপনার নিকট এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন, দয়া করুন এবং আমরা মুক্তিপণ দিচ্ছি এটা নিয়ে তাকে ছেড়ে দিন।

রাসুল সাঃ বললেন, কে তোমাদের সন্তান?  তখন তারা উত্তর দিল, যায়েদই আমার সন্তান। তখন রাসুল (সাঃ) বললেন যায়েদকে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে একটি বিষয়ে আমরা একমত হই আর সেটা হল,

فإنِ اختاركم فهو لكم بغير فداء وإن اختارني فوالله ما أنا بالذي أختار على من اختارني فداء

যদি সে আপনাদের সাথে যেতে চায় তবে মুক্তিপণ ছাড়াই তাকে নিয়ে যেতে পারেন। আর যদি সে আমার কাছে থাকতে চায়, তবে আল্লাহর কসম, আমি এমন ব্যক্তির উপর চাপ সৃষ্টি করিতে পারিনা যে নিজেই থাকতে চায়। তারা বলল,

زدتنا على النَصف وأحسنت

আপনি ইনসাফের চেয়ে বেশী অনুগ্রহ করেছেন।

অতপর যায়েদ রা. কে ডেকে নবীজি সা. বললেন,

هل تعرف هؤلاء

তুমি কি এদেরকে চেনো? যায়েদ রা. বললেন, জ্বি চিনি,

هذا أبي وهذا عمي

ইনি আমার বাবা আর ইনি আমার চাচা। নবীজি সা. বললেন,

فأنا منْ قدْ علِمْتَ وقد رأيتَ صحبتي لك فاخترني أو اخترهما

তুমি জানো আমি কে এবং তোমার প্রতি আমার সংস্পর্শের বিষয়টিও দেখেছো। অতএব এখন তুমি চাইলে আমার কাছেও থাকতে পারো বা তাদের সাথেও যেতে পারো। যায়েদ রা. বললেন,

ما أنا بالذي أختار عليك أحداً أنت مني بمكان الأب والعم

আমি আপনাকে ছেড়ে কাউকে গ্রহণ করবো না। আপনি আমার বাবা এবং চাচার মত। কথাটি শুনে পিতা ও চাচা বললেন,

يا زيد أتختار العبودية على الحرية وعلى أبيك وعمك وأهل بيتك

হে যায়েদ! তুমি আযাদীর তুলনায় গোলামীকে অগ্রাধিকার দিচ্ছো? আর বাপ, চাচা ও পরিবারের লোকদের চেয়ে গোলাম থাকাকেই পছন্দ করছো? হযরত যায়েদ রা. (নবীজি সা. এর দিকে ইশারা করে) বললেন,

نعم إني قد رأيتُ من هذا الرجل شيئاً ما أنا بالذي أختار عليه أحداً

হ্যাঁ, আমি তাঁর মধ্যে এমন বিষয় দেখেছি যার মুকাবেলায় অন্য কোন কিছুই গ্রহণ করতে পারছি না। নবীজি সা. তাঁর এই উত্তর শুনে

أخرجه إلى الحِجْر فقال اشهدوا أن زيداً ابني

তাঁকে কোলে উঠিয়ে নিলেন এবং বললেন, তোমরা সাক্ষি থাকো আমি তাহাকে আপন পুত্র বানিয়ে নিলাম।

فلما رأى ذلك أبوه وعمه طابت أنفسهما وانصرفا

যায়েদ রদিয়াল্লহু আ’নহু এর পিতা ও চাচা এই দৃশ্য দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং খুশিমনে তাঁকে রেখে চলে গেলেন।

فدُعِيَ زيد بن محمد

তখন থেকে তাকে ডাকা হতো, “যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ” নামে।

সূত্র: আল ইসাবাহ ফি তাময়িযিস সাহাবাহ (ইবনে হাজার আসকালানী রহ.) খ: ২ পৃ: ৪৯৬
যাদুল মা’আদ (ইবনে কায়্যিম র.) পৃ: ৩১১
সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ১ পৃ: ২৪৮

খ. আনাস রা.। 

হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

خَدَمْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم عَشْرَ سِنِينَ فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ‏ وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ‏

অর্থ: আমি দশটি বছর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খিদমত করেছি। কিন্তু তিনি কক্ষনো আমার প্রতি উঃ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৬০৩৮

বাচ্চাদের সাথে নবীজির আখলাক

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم مَرَّ عَلَى غِلْمَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ

অর্থ: হযরত আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদল বালকের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন, সে সময় তিনি তাদের সালাম দিলেন।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ২১৬৮

আল্লাহ তা’য়ালার সার্টিফিকেট

হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, হুজুর, নিকটতম ব্যক্তি তো তার নিজের লোকের ব্যাপারে হাজারও মিথ্যাচার করে থাকে। যেমন চরিত্রহীন, দুর্নিতিবাজ, লম্পট নেতাদের ব্যাপারেও চামচা বলে “আমার নেতার চরিত্র ফুলেন মত পবিত্র” অথচ তিনি “নামাজ পড়েন না এক ওয়াক্ত” তবে “ঘুশ খান জম্মের মত।”
স্ত্রীরাও স্বামীদের ব্যাপারে দাম বাড়াতে গিয়ে অনেক সময় চাপাবাজি করে, “আমার স্বামীর মত স্বামীই হয় না”। অতচ তার স্বামী সময়ের সবচে বড় লম্পট।

সে হিসাবে নিকটতম লোকদের কথা কিছু মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য নাও হতে পারে। তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, এ পৃথিবীতে সবচে সত্যবাদী কে? নিশ্চয় আল্লাহ। মহান রব বলেন,

وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللّهِ قِيلاً

অর্থ: আল্লাহর চাইতে অধিক সত্যবাদী কে?
সুরাঃ নিসা আয়াত: ১২২

সে আল্লাহ আমাদের মডেল মুহাম্মাদ সা. এর ব্যাপারে বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ

অর্থ: আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।
সুরাঃ ক্বলাম আয়াত: ৪

অর্থাৎ এই পৃথীবিতে যত সুন্দর চরিত্র হতে পারে, সমস্ত চরিত্রের উপরে আপনার চরিত্র। অর্থাৎ আপনি চরিত্র কন্ট্রোল করেন, চরিত্র আপনাকে কন্ট্রোল করে না।

চরিত্র কয়েক প্রকার হয়ে থাকে।

এক. কেউ কাউকে হামলা করলে তার উপর পাল্টা আক্রমন করা এবং অধিকতর শাস্তি প্রদান করা। এটা জুলুম।

দুই. কেউ কাউকে হামলা করলে তার উপর পাল্টা আক্রমন করা এবং সমপরিমান শাস্তি দেয়া। এটা ইনসাফ তথা ন্যায়সঙ্গত আচরণ।

তিন. কেউ কাউকে হামলা করলে তার উপর পাল্টা আক্রমন না করে, বরং তাকে ক্ষমা করে দেওয়া। এটা এহসান তথা দয়া।

চার. কেউ কাউকে হামলা করলে তার উপর পাল্টা আক্রমন না করে ক্ষমা করে তাকে আরও উল্টো দয়া উপহার দেওয়া। এটাকে বলে خُلُق عَظِيم তথা মহান চরিত্র। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবিবের ব্যাপারে বলেছেন, এই মহান চরিত্রেরও উপরে আপনার অবস্থান।

আল্লাহ তা’য়ালা কেন এমন সার্টিফিকেট দিয়েছেন, তার কয়েকটি নজির নিন্মে পেশ করছি।

শত্রুদের সাথে নবীজি সা. এর উত্তম আখলাক।

১. ইয়ামার সরদার ছিলেন হযরত সুমামা ইবনে উসাল হানাফী রা.।

কোনো একদিন নবীজি সা. সুমামার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সুমামা নবীজি সা. কে হত্যা করতে উদ্যত হলে তার চাচা বাধা প্রদান করে। পরবর্তিতে যখন সুমামা জাহিলী প্রথায় ওমরা করতে রওনা হলেন,

فَلَمَّا قَارَبَ الْمَدِينَةَ أَخَذَتْهُ رُسُلُ رَسُولِ اللَّهِ صلّى الله عليه وسلم

মদীনার নিকটে আসলে প্রতিমধ্যে নবীজি সা. এর সাহাবাদের রা. তাঁকে গ্রেফতার করে নবীজি সা. এর সামনে উপস্থিত করেন।
তাবাকাতে ইবনে সা’আদ খ: ৮ পৃ: ১১১

فَرَبَطُوْهُ بِسَارِيَةٍ مِنْ سَوَارِي الْمَسْجِدِ

এনে মসজিদে নাববীর একটি খুঁটির সঙ্গে তাকে বেঁধে রাখলেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২

নবীজি সা. বললেন,

أتدرون من أخذتم هذا ثمامة بن أثال الحنفي أحسنوا إساره ورجع رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى أهله فقال اجمعوا ما كان عندكم من طعام فابعثوا به إليه

তোমরা জানো কাকে বন্ধি করে এনেছো জানো? ইনি হলেন, সুমামা ইবনে উসাল হানাফী। তার বাধন হালকা করে দাও। নবীজি সা. ঘরে গিয়ে বললেন,তোমাদের কাছে খাদ্য যা আছে জমা করো এবং সুমাত্রা কাছে নিয়ে যাও।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ২ পৃ: ৬৩৯

فَخَرَجَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ أي ما الذي استقر في ظنك أن أفعله بك

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গিয়ে বললেন, ওহে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? অর্থাৎ আমি তোমার সাথে কেমন ব্যবহার করবো বলে তোমার মনে হচ্ছে?
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২ ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬৮৮

فَقَالَ عِنْدِيْ خَيْرٌ يَا مُحَمَّدُ أي لأنك لست ممن يظلم بل ممن يعفو ويحسن

সে উত্তর দিল, হে মুহাম্মাদ! আমার কাছে তো ভালই মনে হচ্ছে। অর্থাৎ (ভাল মনে হওয়ার) কারণ আপনি জুলুম করেন না ,বরং দয়া করে থাকেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২ ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬৮৮

إِنْ تَقْتُلْنِيْ تَقْتُلْ ذَا دَمٍ وَإِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ وَإِنْ كُنْتَ تُرِيْدُ الْمَالَ فَسَلْ مِنْهُ مَا شِئْتَ فَتُرِكَ حَتَّى كَانَ الْغَدُ ثُمَّ قَالَ لَهُ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ قَالَ مَا قُلْتُ لَكَ إِنْ تُنْعِمْ تُنْعِمْ عَلَى شَاكِرٍ فَتَرَكَهُ حَتَّى كَانَ بَعْدَ الْغَدِ فَقَالَ مَا عِنْدَكَ يَا ثُمَامَةُ فَقَالَ عِنْدِيْ مَا قُلْتُ لَكَ فَقَالَ أَطْلِقُوْا ثُمَامَةَ فَانْطَلَقَ إِلَى نَجْلٍ قَرِيْبٍ مِنَ الْمَسْجِدِ فَاغْتَسَلَ ثُمَّ دَخَلَ الْمَسْجِدَ فَقَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ يَا مُحَمَّدُ وَاللهِ مَا كَانَ عَلَى الْأَرْضِ وَجْهٌ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ وَجْهِكَ فَقَدْ أَصْبَحَ وَجْهُكَ أَحَبَّ الْوُجُوْهِ إِلَيَّ وَاللهِ مَا كَانَ مِنْ دِيْنٍ أَبْغَضَ إِلَيَّ مِنْ دِيْنِكَ فَأَصْبَحَ دِيْنُكَ أَحَبَّ الدِّيْنِ إِلَيَّ وَاللهِ مَا كَانَ مِنْ بَلَدٍ أَبْغَضُ إِلَيَّ مِنْ بَلَدِكَ فَأَصْبَحَ بَلَدُكَ أَحَبَّ الْبِلَادِ إِلَيَّ

যদি আমাকে হত্যা করেন তাহলে আপনি একজন খুনীকে হত্যা করবেন। আর যদি আপনি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তিকে অনুগ্রহ করবেন। আর যদি আপনি অর্থ সম্পদ পেতে চান তাহলে যতটা ইচ্ছা দাবী করুন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেই অবস্থার উপর রেখে দিলেন। এভাবে পরের দিন আসল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার তাকে বললেন, ওহে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছে সেটিই মনে হচ্ছে যা আমি আপনাকে বলেছিলাম যে, যদি আপনি অনুগ্রহ করেন তাহলে একজন কৃতজ্ঞ ব্যক্তির উপর অনুগ্রহ করবেন। তিনি তাকে সেই অবস্থায় রেখে দিলেন। এভাবে এর পরের দিনও আসল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে সুমামাহ! তোমার কাছে কেমন মনে হচ্ছে? সে বলল, আমার কাছে তা-ই মনে হচ্ছে যা আমি পূর্বেই বলেছি। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা সুমামাহর বন্ধন ছেড়ে দাও। এবার সুমামাহ মসজিদে নাববীতে প্রবেশ করে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। (তিনি বললেন) হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম! ইতোপূর্বে আমার কাছে যমীনের উপর আপনার চেহারার চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় আর কোন চেহারা ছিল না। কিন্তু এখন আপনার চেহারাই আমার কাছে সকল চেহারা অপেক্ষা অধিক প্রিয়। আল্লাহর কসম! আমার কাছে আপনার দ্বীন অপেক্ষা অধিক ঘৃণিত অন্য কোন দ্বীন ছিল না। এখন আপনার দ্বীনই আমার কাছে সকল দ্বীনের চেয়ে প্রিয়তম। আল্লাহর কসম! আমার মনে আপনার শহরের চেয়ে অধিক খারাপ শহর অন্য কোনটি ছিল না। কিন্তু এখন আপনার শহরটিই আমার কাছে সকল শহর চেয়ে অধিক প্রিয়।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২

হযরত উমর রা. বলে উঠলেন,

لقد كان واللهِ في عَيْني أَصْغَرَ مِنَ الخِنْزيرِ وإنَّه في عَيْني أَعْظَمُ مِنَ الجَبَلِ

আল্লাহর কসম, ছুমামাহ আমার চোখে শূকরের চেয়েও হীন ছিল, কিন্তু এখন আমার  কাছে তাঁর মর্যাদা পাহাড়ের চেয়েও বড়।
সূ্ত্র: মুসনাদে আহমাদ হাদিস: ৭৩৬১

হযরত সুমামা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল,

وَإِنَّ خَيْلَكَ أَخَذَتْنِيْ وَأَنَا أُرِيْدُ الْعُمْرَةَ فَمَاذَا تَرَى فَبَشَّرَهُ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَأَمَرَهُ أَنْ يَعْتَمِرَ فَلَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ قَالَ لَهُ قَائِلٌ صَبَوْتَ قَالَ لَا وَلَكِنْ أَسْلَمْتُ مَعَ مُحَمَّدٍ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم

আপনার অশ্বারোহী সৈনিকগণ আমাকে ধরে এনেছে, সে সময় আমি ‘উমরাহর উদ্দেশে বেরিয়ে ছিলাম। এখন আপনি আমাকে কী হুকুম করেন? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সু-সংবাদ প্রদান করলেন এবং ‘উমরাহ্ আদায়ের নির্দেশ দিলেন। এরপর তিনি যখন মক্কা্য় আসলেন তখন এক ব্যক্তি তাকে বলল, বেদ্বীন হয়ে গেছ? তিনি উত্তর করলেন, না, বরং আমি মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ইসলাম গ্রহণ করেছি।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২

একটি বিষয় হলো,

كانت ميرة قريش ومنافعهم من اليمامة

মক্কার সকল খাদ্যশস্যের যোগান হত ইয়ামামা থেকে।
সূত্র: আল ইসতিআব খ: ১ পৃ: ২৮৮ ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬৮৮

তখন সুমামা রা. কাফেরদের বললেন,

وَلَا وَاللهِ لَا يَأْتِيْكُمْ مِنَ الْيَمَامَةِ حَبَّةُ حِنْطَةٍ حَتَّى يَأْذَنَ فِيْهَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم

আর আল্লাহর কসম! নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুমতি ব্যতীত তোমাদের কাছে ইয়ামামাহ থেকে গমের একটি দানাও আসবে না।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৪৩৭২

হযরত ছুমামাহ রা. নিজ শহরে ফিরে গেলেন এবং মক্কায় শস্য রফতানি বন্ধ করে দিলেন। ফলে কুরাইশরা দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হল। তখন তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে নবীজীর সাথে তাদের আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে চিঠি লিখল। (তারা বলল,)

إن عهدنا بك وأنت تأمر بصلة الرحم وتحض عليها وإن ثمامة قد قطع عنا ميرتنا وأضر بنا فإن رأيت أن تكتب إليه أن يخلى بيننا وبين ميرتنا فافعل

নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার আদেশ করেন। আমরা আপনার আত্মীয়। ছুমামাহ খাদ্যশস্য রফতানি বন্ধ করে দিয়ে আমাদেরকে কষ্টে পতিত করেছে। আপনার দয়া হলে ছুমামাহকে চিঠি লিখুন, যেন আমাদের ভেতর রপ্তানীর অবরোধ উঠিয়ে নেয়।
সূত্র: আল ইসতিআব খ: ১ পৃ: ২৮৮ ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬৮৮

অথচ এই কাফের কারা? এরা তারাই যারা রাসুলুল্লাহ সা. কে নির্মমভাবে কষ্ট দিয়েছে। দেশান্তর করেছে। তাদের দেয়া অত্যাচারের দুটি প্রমাণ দিলাম মাত্রা বুঝার জন্য।

. নবীজির সা. গলায় কাপড় পেঁচিয়ে চিপা দেয়া।

بَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّيْ بِفِنَاءِ الْكَعْبَةِ إِذْ أَقْبَلَ عُقْبَةُ بْنُ أَبِيْ مُعَيْطٍ فَأَخَذَ بِمَنْكِبِ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَلَوَى ثَوْبَهُ فِيْ عُنُقِهِ فَخَنَقَهُ بِهِ خَنْقًا شَدِيْدًا فَأَقْبَلَ أَبُوْ بَكْرٍ فَأَخَذَ بِمَنْكِبِهِ وَدَفَعَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَقَالَ (أَتَقْتُلُوْنَ رَجُلًا أَنْ يَّقُوْلَ رَبِّيَ اللهُ وَقَدْ جَآءَكُمْ بِالْبَيِّنٰتِ مِنْ رَّبِّكُمْ)

একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বার আঙ্গিণায় সালাত আদায় করছিলেন। এমন সময় ‘উকবাহ ইবনু আবূ মু’আইত আসল এবং সে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘাড় ধরল এবং তার কাপড় দিয়ে তাঁর গলায় পেচিয়ে খুব শক্ত করে চিপা দিল। এ সময় আবূ বক্র (রাঃ) হাজির হয়ে তার ঘাড় ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তাকে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, তোমরা কি এ ব্যক্তিকে এ জন্য হত্যা করবে যে সে বলে ‘আমার রব আল্লাহ্’; অথচ তিনি তোমাদের রবের নিকট থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে তোমাদের কাছে এসেছেন।
বুখারী: ৪৮১৫

. উটের ভুড়ি চাপিয়ে দেয়া।

عَنِ ابْنِ مَسْعُودٍ، قَالَ بَيْنَمَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي عِنْدَ الْبَيْتِ وَأَبُو جَهْلٍ وَأَصْحَابٌ لَهُ جُلُوسٌ وَقَدْ نُحِرَتْ جَزُورٌ بِالأَمْسِ فَقَالَ أَبُو جَهْلٍ أَيُّكُمْ يَقُومُ إِلَى سَلاَ جَزُورِ بَنِي فُلاَنٍ فَيَأْخُذُهُ فَيَضَعُهُ فِي كَتِفَىْ مُحَمَّدٍ إِذَا سَجَدَ فَانْبَعَثَ أَشْقَى الْقَوْمِ فَأَخَذَهُ فَلَمَّا سَجَدَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَهُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ قَالَ فَاسْتَضْحَكُوا وَجَعَلَ بَعْضُهُمْ يَمِيلُ عَلَى بَعْضٍ وَأَنَا قَائِمٌ أَنْظُرُ ‏.‏ لَوْ كَانَتْ لِي مَنَعَةٌ طَرَحْتُهُ عَنْ ظَهْرِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم سَاجِدٌ مَا يَرْفَعُ رَأْسَهُ حَتَّى انْطَلَقَ إِنْسَانٌ فَأَخْبَرَ فَاطِمَةَ فَجَاءَتْ وَهِيَ جُوَيْرِيَةُ فَطَرَحَتْهُ عَنْهُ ‏.‏ ثُمَّ أَقْبَلَتْ عَلَيْهِمْ تَشْتِمُهُمْ فَلَمَّا قَضَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم صَلاَتَهُ رَفَعَ صَوْتَهُ ثُمَّ دَعَا عَلَيْهِمْ وَكَانَ إِذَا دَعَا دَعَا ثَلاَثًا ‏.‏ وَإِذَا سَأَلَ سَأَلَ ثَلاَثًا ثُمَّ قَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِقُرَيْشٍ ‏”‏ ‏.‏ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ فَلَمَّا سَمِعُوا صَوْتَهُ ذَهَبَ عَنْهُمُ الضِّحْكُ وَخَافُوا دَعْوَتَهُ ثُمَّ قَالَ ‏”‏ اللَّهُمَّ عَلَيْكَ بِأَبِي جَهْلِ بْنِ هِشَامٍ وَعُتْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ وَشَيْبَةَ بْنِ رَبِيعَةَ وَالْوَلِيدِ بْنِ عُقْبَةَ وَأُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ وَعُقْبَةَ بْنِ أَبِي مُعَيْطٍ ‏”‏ ‏.‏ وَذَكَرَ السَّابِعَ وَلَمْ أَحْفَظْهُ فَوَالَّذِي بَعَثَ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم بِالْحَقِّ لَقَدْ رَأَيْتُ الَّذِينَ سَمَّى صَرْعَى يَوْمَ بَدْرٍ ثُمَّ سُحِبُوا إِلَى الْقَلِيبِ قَلِيبِ بَدْرٍ ‏.‏

অর্থ: হযরত ইবনু মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহিল হারামের নিকট সালাত আদায় করছিলেন। আবূ জাহল ও তার সাথীরা অদূরে উপবিষ্ট ছিল। পূর্বদিন সেখানে একটি উট নহর করা হয়েছিল। আবূ জাহল বলল, কে অমুক গোত্রের উটের (নাড়ি-ভূড়িসহ) জরায়ুকে নিয়ে আসবে এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সিজদারত হবে, তখন তার দু’কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দেবে? তখন সম্প্রদায়ের সবচাইতে হতভাগা দূরাচার লোকটি উঠে দাঁড়ালো এবং তা নিয়ে আসলো এবং যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গেলেন তখন তার দু’কাঁধের মাঝখানে তা রেখে দিল। তখন তারা হাসাহসি করতে লাগলো এবং একে অপরের গায়ের উপর ঢলে পড়তে লাগলো, আর আমি তখন দাঁড়িয়ে তা দেখলাম। যদি আমার প্রতিরোধের সাধ্য থাকতো তবে আমি তা অবশ্যই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠ থেকে ফেলে দিতাম।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় রইলেন এবং তিনি মাথা উঠাতে পারছিলেন না। অবশেষে একব্যক্তি গিয়ে ফাতিমাহকে খবর দিল। ফাতিমাহ সাথে সাথে আসলেন। আর তিনি তখন বালিকা। তিনি তা তার উপর থেকে ফেলে দিলেন। তারপর তাদের দিকে মুখ করে তাদেরকে মন্দাচারের বিষয়ে বলছিলেন। তারপর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত সম্পন্ন করলেন তখন উচ্চস্বরে তাদেরকে বদদুআ দিলেন আর তিনি যখন দু’আ করতেন (সাধারণতঃ) তিনবার করতেন এবং যখন কিছু প্রার্থনা করতেন তখন তিনি তিনবার করতেন।

তারপর তিনি তিন তিনবার বললেন “ইয়া আল্লাহ! তোমার উপরেই কুরায়শদের বিচারের ভার ন্যস্ত করলাম। যখন তারা তার আওয়াজ শুনতে পেল তখন তাদের হাসি চলে গেল এবং তারা তার বদ দু’আয় ভয় পেয়ে গেল। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আবূ জাহল ইবনু হিশাম, উতবাহ ইবনু রাবী’আহ, শাইবাহ ইবনু রাবী আহ, ওয়ালীদ ইবনু উকবাহ, উমাইয়াহ ইবনু খালাফ ও উকবাহ ইবনু আবূ মুআয়তের শাস্তির ভার তোমার উপর ন্যস্ত। রাবী বলেন, তিনি সপ্তম আরেকজনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। আমি তা স্মরণ রাখতে পরিনি। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে যে পবিত্র সত্তা সত্যসহ রসূলরূপে প্রেরণ করেছেন, তার কসম! তিনি যাদের নাম সেদিন উচ্চারণ করেছিলেন বদরের দিন তাদের পতিত লাশ আমি দেখেছি। তারপর তাদের হেঁচড়িয়ে বদরের একটি নোংরা কূপে নিক্ষেপ করা হয়। আবূ ইসহাক বলেন, ওয়ালীদ ইবনু উকবার নাম এখানে ভুলে হয়েছে।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ১৭৯৪

فَرَأَيْتُهُمْ قُتِلُوْا يَوْمَ بَدْرٍ فَأُلْقُوْا فِيْ بِئْرٍ غَيْرَ أُمَيَّةَ بْنِ خَلَفٍ أَوْ أُبَيٍّ تَقَطَّعَتْ أَوْصَالُهُ فَلَمْ يُلْقَ فِي الْبِئْرِ

ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলেন, আমি এদের সবাইকে বাদ্র যুদ্ধে নিহত অবস্থায় দেখেছি। উমাইয়া অথবা উবাই ছাড়া তাদের সকলকে সে দিন একটি কূপে ফেলা হয়েছিল। তার জোড়গুলি এমনভাবে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল যে তাকে কূপে ফেলা যায়নি।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস:৩৮৫৪

নবীজি সা. নিজে প্রতিশোধ নিতেন না।

নবীজি সা. এর উপর যারাই কষ্ট দিয়েছে, তাদেরকে তিনি কখনও প্রতিঘাত করেননি, বরং
হযরত আম্মাজান আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

وَمَا نِيلَ مِنْهُ شَىْءٌ قَطُّ فَيَنْتَقِمَ مِنْ صَاحِبِهِ إِلاَّ أَنْ يُنْتَهَكَ شَىْءٌ مِنْ مَحَارِمِ اللَّهِ فَيَنْتَقِمَ لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ

অর্থ: যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনিষ্ট করেছে, তার থেকে প্রতিশোধও নেননি। তবে আল্লাহর মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় এমন বিষয়ে তিনি তার প্রতিশোধ নিয়েছেন।
সূত্র: সহীহ মুসলিম হাদিস: ২৩২৮

হযরত আলী রা. বলেন, নবীজি সা. বলেছেন,

اعْفُ عمَّن ظلمك وصِلْ من قطعك وأحسِنْ إلى من أساء إليك وقُلِ الحقَّ ولو على نفسِك

অর্থাৎ তোমার উপর যে জুলুম করে তাকে ক্ষমা করে দাও, যে সম্পর্কচ্ছেদ করে তার সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলো, যে কষ্ট দেয় তার উপর আরও অনুগ্রহ করো।
সূত্র: আত তারগীব খ: ৩ পৃ: ২৮৬

যখন কুরাইশের নেতারা নবীজি সা. এর কাছে ইয়ামামার অবরোধ উঠিয়ে নেয়ার জন্য দরখাস্ত করল, তখন নবীজি সা. প্রতিশোধ না নিয়ে বরং সুমামাকে লিখলেন,

أن خل بين قومي وبين ميرتهم

হে সুমামা, আমার কওমের কাছে রপ্তানীর অবরোধ উঠিয়ে নাও।
সূত্র: আল ইসতিআব খ: ১ পৃ: ২৮৮ ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬৮৮

হযরত ছুমামাহ রাযিআল্লাহু আনহু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশে কুরাইশদের উপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিলেন।

২. উসমান ইবনে তালহা রা. ও কা’বার চাবির ঘটনা।

অর্থ: হযরত উসমান ইবনে তালহা রা. বলেন, হিজরতের পূর্বে নবীজি সা. মক্কায় একদিন আমার সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলেন। তখন আমি বলেছিলাম,

يا محمد العجب لك حيث تطمع ان اتبعك وقد خالفت دين قومك وجئت بدين محدث ففرقت جماعتهم والفتهم واذهبت بَهاءهم فانصرف

হে মুহাম্মাদ, আমি আশ্চর্য হচ্ছি এটা ভেবে যে, তুমি তোমার কওমের ধর্মের বিরোধিতা করে নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছো, তাদের ঐক্য ও ভালোবাসায় ফাটল সৃষ্টি করেছো এবং তাদের গৌবরময় ধংশ করে দিয়েছো। আবার আমাকে তোমার অনুসরন করাতে চাচ্ছো! অত:পর নবীজি সা. চলে গেলেন।
সূত্র: তাবাকাতে ইবনে সা’আদ খ: ৫ পৃ: ১৬ তাফসীরে মাযহারী খ: ২ পৃ: ১৩৭

فاقبل يوما يريد ان يدخل الكعبة مع الناس فغلظت عليه ونلت منه فحلم عنى

একদিন নবীজি সা. সাহাবাদের নিয়ে কা’বায় ঢুকতে চাইলেন, কিন্তু আমি কা’বার দরজা বন্ধ করে দিলাম এবং অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করলাম। ফলে তিনি ধৈর্যধারণ করে বললেন,

يا عثمان لعلك سترى هذا المفتاح يوما بيدي أضعه حيث شئت

হে উসমান, খুব দ্রুত একটা দিন এমন আসবে যেদিন এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে, সেদিন আমি যেখানে মন চায় সেখানে এ চাবি রাখবো। উসমান রা. (ঠাট্রা করে) বললেন,

لَقَدْ هَلَكَتْ قُرَيْشٌ يَوْمَئِذٍ وَذَلّتْ

নিশ্চয় সেদিন কুরাইশরা ধ্বংশ হয়ে যাবে এবং অপদস্ত হবে। (যা কখনও সম্ভব না, আর হে মুহাম্মাদ, তোমার স্বপ্নও কখনও পুরণ হবে না।নবীজি সা. বললেন,

فَقَالَ بَلْ عَمَرَتْ وَعَزّتْ يَوْمَئِذٍ وَدَخَلَ الْكَعْبَةَ

বরং সেদিন কুরাইশরা আরও আবাদ হবে এবং সম্মানিত হবে এবং কা’বায় প্রবেশ করবে। উসমান রা. বলেন,

فوقعت كلمة منى موقعا ظننت ان الأمر سيصير الى ما قال فاردت الإسلام و مقاربة محمد فاذا قومى يزبروننى زبرا شديدا ويزرون برائي فامسكت عن ذكره

সেদিন আমার মনে একটি কথা গেথে গেল, আমি ধারণা করলাম “মুহাম্মাদ যা বলল, সেটা খুব দ্রুতই হবে। ফলে আমি ইসলাম গ্রহণ করতে চাইলাম এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর নৈকট্য অর্জন করতে চাইলাম। কিন্তু আমার কওমের লোকেরা এ ব্যাপার আমাকে খুব শাঁসালো। ফলে আমি এ বিষয়ে আলোচনা থেকে চুপ হয়ে গেলাম।
সূত্র: তাবাকাতে ইবনে সা’আদ খ: ৫ পৃ: ১৬ তাফসীরে মাযহারী খ: ২ পৃ: ১৩৭ তারিখে দিমাশক খ: ২১ পৃ: ৩৩৪

নবীজি সা. হিজরত করে চলে যাচ্ছেন।

১. একবার একটু ভেবে দেখুন তো, কত নির্মম সেই ইতিহাস। যখন নবীজি সা. সবাইকে ফেলে একটা মাদীনার প্রান্তরেখা চলে যাচ্ছেন। আজ তিনি কত দিনের জন্য যাচ্ছেন তিনিও জানেন না। অথচ দুই পাঁচ বছরের জন্য কেউ বিদেশে কাজ করতে যাবার সময় বাড়িতে কি করুণ ইতিহাস। ১ সপ্তাহ আগ থেকেই বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। একবার বন্ধু বান্ধব থেকে বিদায় নেয়। একবার স্ত্রীর সামনে গিয়ে কাঁদে। একবার সন্তানকে কোলে নিয়ে কাঁদে। কখনও বাবার চোখে চোখ রেখে অশ্রুসিক্ত হয়, কখনও মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদে। কখনও পুকুর পাড়, কখনও রান্না ঘর কখনও ঘরের আঙ্গিনা দেখে কাঁদে।

আজ নবীজি সা. যাচ্ছেন, তো স্বাভাবিক কখনও কা’বা নজরে আসে, কখনও নিজের ঘরবাড়ি,সন্তান আত্মীয়। দেখছেন আর অশ্রুসিক্ত হচ্ছেন।

প্রবাসীরা তো নির্দিষ্ট একটা টাইম নিয়ে যায়, ইচ্ছে হলে ফিরেও আসতে পারবে এয়ার্পোর্ট থেকে। তবে আজ নবীজি সা. সবাইকে রেখে যাবেন, কিন্তু কতদিন পর সন্তানদের সাথে দেখা হবে তিনি জানেননা।

প্রবাসীরা তো যেদিন চলে যায়, সেদিন তো বিদায় দেয়ার মত কত মানুষ থাকে। কিন্তু আজ নবীজির বাবা-মা কেউ নেই। কি নির্মম সেদিনের ইতিহাস।

মক্কা বিজয়ের দিন

মক্কা বিজয়ের দিন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশ করে দেখলেন,

ثلاثمائةٍ وستونَ صنَمًا قدْ شدَّ لهم إبليسُ أقدامَها بالرصاصِ فجاء ومعه قَضيبٌ

সূত্র: মাজমাউয যাওয়ায়েদ হাদিস: ১১১৩৮ তবরানী: ১০৬৫৬

فما أشار إلى صنم منها في وجهه إلا وقع لقفاه ولا أشار إلى قفاه إلا وقع لوجهه حتى ما بقي منها صنم إلا وقع

তখন বাইতুল্লাহর চারপাশ ঘিরে তিনশত ষাটটি প্রতিমা স্থাপিত ছিল। তিনি হাতে একটি লাঠি নিয়ে প্রতিমাগুলোর দিকে স্পর্শ ছাড়াই শুধু লাঠি দিয়ে ইশারা করছিলেন,
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ২ পৃ: ৪১৬-৪১৭
সিয়ারু আলামিন নুবালা খ: ২৭ পৃ: ১৭৭

আর বলতে থাকলেন,

جَاءَ الْحَقُّ وَزَهَقَ الْبَاطِلُ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيْدُ

হক এসেছে, বাতিল অপসৃত হয়েছে। হক এসেছে, বাতিলের উদ্ভব বা পুনরুত্থান আর ঘটবে না।
সূত্র: বুখারী: ৪২৮৭

৭১ সালের রাজাকারদের বিরুদ্ধে আজও বিচার চলছে। অথচ যখন মক্কা বিজয় হলো, তখন নবীজি সা.বায়তুল্লাহ তওয়াফ করে দু’রাকাত নামাজ পড়লেন, অতপর দুই হাতে (বায়তুল্লাহ্) দরজা ধরে মক্কাবাসীকে জিজ্ঞেস করলেন,

ما تقولون وما تظنُّون فقالوا نقول أخٌ وابنُ عمٍّ حليمٌ رحيمٌ

তোমরা কি ধারণা করছো? (তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহার করবো বলে তোমাদের ধারণা?) তখন তারা বলল, আমরা মনে করি, ভ্রাতিত্বের পরিচয়ে দয়া ও ধৈর্যশীলের পরিচয় দিবেন। কথাটি তারা তিনবার বললেন।

তখন নবীজি সা. বললেন,

أقول كما قال يوسفُ لا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ الْيَوْمَ يَغْفِرُ اللهُ لَكُمْ وَهُوَ أَرْحَمُ الرّاحِمِينَ

আমি আজ বলবো সে কথা যেমনটা বলেছিলেন, ইউসুফ আ. অর্থাৎ আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের কে ক্ষমা করুন। তিনি সব মেহেরবানদের চাইতে অধিক মেহেরবান।
সুরাঃ ইউসুফ আয়াত: ৯২

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,

فخرجوا كأنما نُشِرُوا من القبورِ فدخلوا في الإسلامِ

অতপর তাঁরা চারদিক থেকে এমনভাবে বেরিয়ে আসল যেন তাদেরকে কবর থেকে বের করা হয়েছে। অতপর তারা ইসলামে প্রবেশ করে মুসলমান হয়ে গেলেন।
সূত্র: দালায়েলুন নবুওয়াহ খ: ৫ পৃ: ৫৮

কা’বার চাবি তালাশ করা

فطلب رسول الله صلى الله عليه وسلم المفتاح فقيل له إنه مع عثمان

নবীজি সা. কা’বার চাবি তালাশ করলে বলা হলো, চাবি উসমানের কাছে।

فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : أين عثمان بن طلحة

নবীজি সা. বললেন, উসমান ইবনে তালহা কোথায়?
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ২ পৃ: ৪১৩

এক বর্ণনায় এসেছে,

أغلق عثمان باب البيت وصعد السطح فطلب منه فأبى وقال لو علمت أنه رسول الله صلى الله عليه وسلم لم أمنعه المفتاح فلوى علي بن أبي طالب يده وفي رواية عنقه وأخذ منه المفتاح

উসমান কা’বার দরজা বন্ধ করে ছাদে উঠে অবস্থান করছিলেন, নবীজি সা. তাঁর কাছে চাবি চাইলে তিনি দিতে অস্বীকার করলেন। উসমান রা. বলেন, যদি আমি জানতাম যে, তিনি আল্লাহর রাসুল তাহলে চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানাতাম না। অতপর আলী রা. তাঁর হাত কোন বর্ণানায় ঘাড় ধরে মুড়িয়ে দিয়ে চাবি নিয়ে নিলেন।
তাফসীরে মাযহারী খ: ২ পৃ: ১৩৯

অপর বর্ণনায় এসেছে, নবীজি সা. বেলাল রা. কে উসমানের বাড়ি পাঠালেন। বেলাল রা. গিয়ে বললেন,

ان رسول الله صلي الله عليه وسلم يأمرك ان تأتي بمفتاح الكعبة

আল্লাহর রাসুল সা. তোমাকে কা’বার চাবি নিয়ে যেতে আদেশ করেছেন। উসমান বললেন, ঠিক আছে। বেলাল রা. নবীজির সা. কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, উসমান দেবে বলল। বেলাল রা. নবীজির সাথে বসে থাকলেন ইতিমধ্যে উসমান রা. তাঁর মাকে চাবি দিতে বললেন, কারণ চাবি তাঁর মায়ের কাছে ছিল। তাঁর মা ছিলেন শায়বার মেয়ে। উসমান বললেন,

يا أمّه اعطني المفتاح فان رسول الله صلى الله عليه وسلم قد أرسل إليَّ وأمرني أن آتيه به

হে মা, আমাকে চাবিটা দিয়ে দেন, কারণ রাসুলুল্লাহ সা. আমাকে চাবি নিয়ে তাঁর কাছে যেতে আদেশ পাঠিয়েছেন।
সূত্র: তারিখে দিমাশক খ: ২১ পৃ: ৩৩৭

فَأَبَتْ أَنْ تُعْطِيَهُ فَقَالَ وَاللَّهِ لَتُعْطِينِيهِ أَوْ لَيَخْرُجَنَّ هَذَا السَّيْفُ مِنْ صُلْبِي

কিন্তু তিনি তাকে চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান। উসমান রা. বললেন, আল্লাহর শপথ, তাঁকে চাবি দিন, অন্যথায় এ তরবারি আমার পিঠ ভেদ করে চলে যাবে।
মুসলিম: ১৩২৯

তিনি মাকে আরও বললেন,

فوالله لتدفَعِنَّهُ، أو ليأتين غيري فيأخذه منك، فأدخلته في حجزتها فبينما هما على ذلك وهو يكلمها إذ سمعت صوت أبي بكر وعمر في الدار، وعمر رافع صوته حين أبطأ عثمان: يا عثمان اخرج.

আল্লাহর কসম, নবীজিকে সা. চাবি দিন, না হয় আমার পরিবর্তে অন্য কেউ এসে আপনার থেকে চাবি নিয়ে যাবে। তারা কথা বলা অবস্থায় দেরি করায় হঠাৎ ঘরে আবু বকর রা. ও ওমর রা. এর কণ্ঠ শুনতে পেলেন, ” উসমান, বের হও।
সূত্র: তারিখে দিমাশক খ: ২১ পৃ: ৩৩৭

فَأَعْطَتْهُ إِيَّاهُ ‏فَجَاءَ بِهِ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم

অতঃপর তাঁর মা তাঁকে চাবি দিয়ে দিলেন। তিনি চাবি নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন
মুসলিম: ১৩২৯

فَدَفَعَهُ إِلَيْهِ فَفَتَحَ الْبَابَ

অতপর নবীজির সা. নিকট চাবি হস্তান্তর করেন। তিনি কা’বার দরজা খুললেন।
মুসলিম: ১৩২৯

কাবার ভেতর

أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم لَمَّا قَدِمَ مَكَّةَ أَبَى أَنْ يَدْخُلَ الْبَيْتَ وَفِيْهِ الْآلِهَةُ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা্য় আগমন করার পর তৎক্ষণাৎ বাইতুল্লাহর ভিতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রইলেন, কেননা সে সময় বাইতুল্লাহর ভিতরে অনেক প্রতিমা স্থাপিত ছিল।
বুখারী: ৪২৮৮

أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ زَمَنَ الْفَتْحِ وَهُوَ بِالْبَطْحَاءِ أَنْ يَأْتِيَ الْكَعْبَةَ، فَيَمْحُوَ كُلَّ صُورَةٍ فِيهَا،

মক্কা বিজয়ের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল-বাতহা’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে আদেশ দিলেন যেন তিনি কা‘বার ভিতরে গিয়ে এর মধ্যে বিদ্যমান সব ছবি মিটিয়ে দেন।
সুনান আবু দাউদ হাদিস: ৪১৫৬

وكان عمر قد ترك صورة إبراهيم، فلما دخل رسول الله صلى الله عليه وسلم رأى صورة إبراهيم، فقال: يا عمر: ألم آمرك ألا تدع فيها صورة الا محوتها قال عمر صورة كانت صورة ابراهيم قال فامحها

ওমর রা. ইবরাহীম আ: এর প্রতিমা না ভেঙ্গে রেখে দিলেন, নবীজি সা. যখন কা’বায় প্রবেশ করলেন, তখন ইবরাহীম আ. এর প্রতিমা দেখে বললেন, হে ওমর, তোমাকে বললাম না সব প্রতিমা ধংশ করতে? ওমর রা. বললেন, সেটা তো ইবরাহীম আ. ওর প্রতিমা। নবীজি সা. বললেন, সেটাও ধংশ করো।
তারিখে দিমাশক খ: ২১ পৃ: ৩৩৭

فَأُخْرِجَ صُوْرَةُ إِبْرَاهِيْمَ وَإِسْمَاعِيْلَ فِيْ أَيْدِيْهِمَا مِنَ الْأَزْلَامِ فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَاتَلَهُمْ اللهُ لَقَدْ عَلِمُوْا مَا اسْتَقْسَمَا بِهَا قَطُّ ثُمَّ دَخَلَ الْبَيْتَ

তখন ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এর মূর্তিও বেরিয়ে আসল। তাদের উভয়ের হাতে ছিল মুশরিকদের ভাগ্য নির্ণয়ের কয়েকটি তীর। তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন। তারা অবশ্যই জানত যে, ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) কক্ষনো তীর দিয়ে ভাগ্য নির্ণয় করেননি।
বুখারী: ৪২৮৮

فَيَمْحُوَ كُلَّ صُورَةٍ فِيهَا، فَلَمْ يَدْخُلْهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى مُحِيَتْ كُلَّ صُورَةٍ فِيهَا

জাবির (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। মক্কা বিজয়ের সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল-বাতহা’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে আদেশ দিলেন যেন তিনি কা‘বার ভিতরে গিয়ে এর মধ্যে বিদ্যমান সব ছবি মিটিয়ে দেন। অতঃপর সব ছবি মিটিয়ে দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভিতরে প্রবেশ করেননি।
সুনান আবু দাউদ হাদিস: ৪১৫৬

عن أسامة قال : دخلت على رسول الله صلى الله عليه وسلم في الكعبة فرأى صورا ، فدعا بدلو من ماء ، فأتيته به ، فضرب به الصور

নবীজি সা. কা’বার ভেতর কিছু ছবি দেখে পানি ভর্তি বালতি আনতে বললেন, আমি নিয়ে আসলে সেটা দিয়ে নবীজি সা. শেষ করলেন।
সূত্র: ফাতহুল বারী খ: ৩ পৃ: ৫৪৭

মনে রাখবেন, হিন্দুদের মন্দিরে থাকা মূর্তির প্রতিবাদ করা হয়নি, বরং আল্লাহর ঘরে এসব শিরক থাকা নবীজি বরদাশত করেননি। অথচ এ মূর্তি পাথরের, মূর্তির তো কোনো অপরাধ নেই। এরপরও শিরকের মাধ্যম হওয়ায় সেগুলো নবীজি সা. সেগুলো বরদাশত করেননি। এ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি ভন্ডপীররা মূর্তির চেয়েও খারাপ, কারণ এরা মানুষ, এরা গুনাহগার। নিস্পাপ মূর্তিকে যদি মুসলমানদের ঘরে রাখা না যায়, ভন্ডপীরদের শিরকের মাজার এবং ঘরের ছবি ছিড়ে ফেলা এটাও নবীজির শিক্ষা।

নবীজি সা. কা’বায় যখন কাবা থেকে বের হলেন

আব্বাস রা. কা’বার চাবি কামনা করলেন।

فلما خرج سأله العباس أن يعطيه المفتاح فيجمع له بين السقاية والسدانة

যখন নবীজি সা. কা’বা থেকে বের হলেন, আব্বাস রা. তাঁর কাছে কা’বার চাবি দিতে বললেন, যেন হাজীদের পানি পান করানো ও কা’বার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একত্রিত করতে পারেন।
সূত্র: আল মাওয়াহেবুল লাদুনিয়্যাহ খ: ১ পৃ: ৩২৩

আলী রা. কা’বার চাবি কামনা করলেন।

নবীজি সা. কা’বা থেকে বের হওয়ার পর

فَقَامَ إلَيْهِ عَلِيّ رَضِيَ اللّهُ عَنْهُ وَمِفْتَاحُ الْكَعْبَةِ فِي يَدِهِ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللّهِ اجْمَعْ لَنَا الْحِجَابَةَ مَعَ السّقَايَةِ صَلّى اللّهُ عَلَيْك

আলী রা. নবীজির সা. সামনে দাঁড়ালেন, তাঁর হাতে ছিল কা’বার চাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও পানি পান করানোর দায়িত্ব আমাদেরকে দিন। আল্লাহ আপনার উপর রহমত বর্ষণ করুন।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ২ পৃ: ৪১৩

চাবি অর্পন

فأمر رسول الله عليًّا أن يرد المفتاح إلى عثمان بن طلحة ويعتذر إليه، ففعل ذلك عليّ، فقال له عثمان: يا عليّ أكرهت وآذيت ثم جئت ترفق؟ فقال: لقد أنزل الله في شأنك، وقرأ عليه هذه الآية

নবীজি সা. আলী রা. কে বললেন, যের চাবিটা উসমানকে দিয়ে দেয় এবং তার কাছে ক্ষমা চায়। আলী রা. সেটাই করলেন।
উসমান রা. বললেন, হে আলী, আমার উপর জোরজবরদস্তি করলে, কষ্ট দিলে আবার নম্রতার সাথে আসলে কারণ কি? তিনি বললেন, আল্লাহ তা’য়ালা তোমার ব্যাপারে আয়াত নাজিল করেছেন এবং এ আয়াতটি পড়লেন,

إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের নিকট পৌছে দাও।
সুরাঃ নিসা আয়াত: ৫৮
সূত্র: তাফসীরে বগবী খ: ১ পৃ: ৩৫৩
আল মাওয়াহেবুল লাদুনিয়্যাহ খ: ১ পৃ: ৩২৩

নবীজি সা. উসমান রা. কে বললেন,

هاك مفتاحك يا عثمان ، اليوم يوم بر ووفاء

হে উছমান, তোমার চাবি নাও। আজ অনুগ্রহের ও বিশ্বস্ততা রক্ষার দিন।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম খ: ২ পৃ: ৪১৩

চাবি গোপন করে রাখার নির্দেশ।

ان رسول الله صلى الله عليه وسلم لما ناول عثمان المفتاح قال له غيّبه قال الزهري فلذلك يغيب المفتاح

যখন উসমান চাবি পাইলেন, নবীজি সা. বললেন, চাবিটা গোপন রেখো। যুহরী রহ. বলেন, তিনি সব সময় চাবিটা গোপন রাখতেন।
চাবি দেয়ার পর।
সূত্র: ফাতুহুল বারী খ: ৭ পৃ: ৬১২

উসমান রা. বলেন,

فَلَمّا وَلّيْت نَادَانِي فَرَجَعْتُ إلَيْهِ فَقَالَ :” أَلَمْ يَكُنْ الّذِي قُلْتُ لَكَ؟” قَالَ فَذَكَرْت قَوْلَهُ لِي بِمَكّةَ قَبْلَ الْهِجْرَةِ لَعَلّك سَتَرَى هَذَا الْمِفْتَاحَ بِيَدِي أَضَعُهُ حَيْثُ شِئْت فَقُلْتُ بَلَى أشهد أن محمدا رسول الله

যখন আমি চাবি নিয়ে চলে যাচ্ছিলাম, নবীজি সা. আমাকে ডাকলেন, আমি ফিরে গেলাম নবীজি সা. আমাকে বললেন, আমি যেমনটি বলেছিলাম তেমনটি কি হয়নি? আমি হিজরতের পূর্বের মক্কার সেই কথাটি স্বরণ করলাম, নবীজি সা. বলেছিলেন, “হে উসমান, খুব দ্রুত একটা দিন এমন আসবে যেদিন এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে, সেদিন আমি যেখানে মন চায় সেখানে এ চাবি রাখবো।” আমি বললাম, জ্বী হ্যাঁ, অতপর আমি বললাম, আমি আজ সাক্ষি দিলাম মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।
সূত্র: মাওয়াহেবুল লাদুনিয়্যাহ খ: ১ পৃ: ৫৮৭

জিব্রাঈল আ. এর আগমন

فجاء جبريل عليه السلام فقال ما دام هذا البيت أو لبنة من لبناته قائمة فإن السدانة في أولاد عثمان فهو اليوم في أيديهم

অতপর জিব্রাঈল আ. আসলেন, এবং বললেন, যতদিন এই কা’বা ঘরের একটি ইটও থাকবে, ততদিন এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে উসমানের বংশধরের হাতে। আজও এটা তাঁদের হাতেই রয়েছে।
সূত্র: মাওয়াহেবুল লাদুনিয়্যাহ খ: ১ পৃ: ৫৮৮

প্রিয় পাঠক, এটাই ছিল আমাদের মডেল মুহাম্মাদ সা. এর মহান আখলাকের কিঞ্চিত নমুনা।

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরি মাক্কী রা

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজেরি মাক্কী র. যখন মক্কায় গিয়েছিলেন, তখন একটি তরবারী কা’বার চাবি রক্ষকের কাছে দিয়ে এসে বলেছিলেন, হযরত মাহদী আ. আসলে এ তরবারী যেন হাত বা হাত তাঁর হাতে পৌঁছায়।

 

যোগ্যতা

অনেকে বলতে পারেন, শুধু চেহারা আর চরিত্র থাকলেই তাকে সবাই মানে না। যারা শিক্ষিত মহল, তারা যোগ্যতার বিষয়টি খেয়াল করে।সে হিসাবে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিরা বলে থাকেন, আপনার মুহাম্মাদকে আমরা মানি না। কারণ তিনি কোনো শিক্ষিত এবং যোগ্য মানুষ ছিলেন না। কারণ আপনারা মুহাম্মাদের অনুসারীরাই বলেন, নবি নাকি উম্মি! তো উম্মি মানে তো মুর্খ। অর্থাৎ

من لا لا يقدر علي القراءة والكتابة

অর্থাৎ যিনি লিখতেও পারতেন না এবং পড়তেও পারতেন না। তাহলে আমরা শিক্ষিত হয়ে মূর্খ নবিকে কেন মানবো?

জবাব:১

উম্মি মানে জাহেল নয়। যিনি লেখা পড়া না করেই শিক্ষক হিসাবে দুনিয়াতে এসেছেন।

انما انا بعثت معلما

আল্লাহই সাক্ষি।

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

অর্থ: তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।
সুরাঃ জুমআ আয়াত: ২

বুঝলে বলুন তো, কেউ লেখাপড়া করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার, আরেকজন কারো কাছে না পড়েই যদি টিচার হয়, তাহলে সুনাম বেশি হয় কার? যদি তাই হয়, তাহলে বলবো, তিনি এমন শিক্ষিত ছিলেন যে, লেখাপড়া না করেই শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পুরো পৃথিবীর মানব-দানব সবার শিক্ষক ছিলেন।

তিনি লেখাপড়া জানলে সমস্যা কোথায়?
১. বেঈমানরা বলতো, সে তো ভালো শিক্ষিত, আগের যুগের ধর্মগ্রন্থের কথা বলছে নিশ্চয় পড়ালেখা করে।

কারণ হুজুররা যা করে সেটাই তাদের নজরে ভুল হয়। ভালো কাপড় পরলে বলে, সামাজিকতা বোঝে না , আবার দামি কাপড় পরলে বলে, নিশ্চয় তাহেরীর মত মিলাদ পড়ে ধান্ধামী করছে।

বুড়ো মানুষের অবস্থা যেমন। ঘরে থাকলে জোয়ান পোলাপান বলে, এই বুড়া, সারাদিন ঘরে কি করো, দোকানপাটে যেতে পারে না? বেচারা যখন দোকানে যায়, তখন বলে, এই বুড়া বয়সে দোকানে কি করো, মসজিদে থাকতে পারো না? মসজিদে গেলে আবার বলে, সারাজিবন সুদঘুশ খেয়ে এখন হাসান বসরী সাজছো লজ্জা করে না?

ঠিক হুজুরদের অবস্থাও তাই, হুজুররা রাজনীতি না করলে বলে, আপনারা দুনিয়ার অবস্থা সম্পর্কে অনেক পিছিয়ে, রাজনিতি-টাজনিতি বোঝেন না, আবার যখন কিছু হুজুররা রাজনিতী করতে যায়, তখন বলে, হুজুররাও কেন রাজনীতি করবে?

আমার কথাও তো সেটা, হুজুররা কেন রাজনীতি করবে? রাজনীতি তো কোনো ভালো মানুষের কাজ না, ওগুলো করবে তারা যারা রিলিপের চাল, জনগনের টাকা চুরি করবে তাদের কাজ। এরাই বক্তব্য দেয়, হুজুররা কেন রাজনীতিতে আসবে? কারণ রাজনীতিতে হুজুররা আসলে তো ওদের বড় বড় বতল খেতে পারবে না, জনগণের টাকা আত্মস্যাৎ করে বড় বড় বিল্ডিং হাকাতে ডিস্টার্ব হয়, এজন্য হুজুরদের রাজনীতি ওদের সহ্য হয় না।

যাহোক বলছিলাম, নবীজি সা. যদি লেখাপড়া জানতেন, তাহলে
১. কাফেররা বলতো, মুহাম্মাদ তো পড়ালেখা করেই সব বলে, অতএব তাকে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। তাদের এই বলাটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন আল্লাহ। অর্থাৎ হে বেঈমানরা দেখো, মুহাম্মাদ যদি নবী না হয়, তাহলে লেখাপড়া না জেনেও শিক্ষিত মানুষের মত এত কথা বলে কেমনে? নিশ্চয় ওহী আসে। এটা ছিল নবীজি সা. এর একটি মো’জেজা।

২. নবীজির জন্য নিশ্চয় একজন শিক্ষক লাগতো, সে শিক্ষকও তো তাঁকে নবি হিসাবে মানতে না। বলতো, তার কথা কি মানবো, সে তো আমার কাছেই পড়ালেখা করেছে। সে পথও আল্লাহ তা’য়ালা বন্ধ করে দিয়েছেন।

তাঁর পড়ালেখা না জানা কোনো দোষের নয়, কারণ যারা বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে জাতিকে যা উপহার দিয়েছে, নবীজি সা. পড়ালেখা না করেই বিশ্ববাসীকে শিক্ষিত হওয়ার সকল জ্ঞান উপহার দিয়ে গেছেন।

যেমন তিনি লেখাপড়া না জেনেই পৃথিবীর শ্রেষ্ট কিতাব উপহার দিয়েছেন। সেটা হলো আল কুরআন।

তারপরও যারা এ প্রশ্ন করে যে, মুহাম্মাদ তো মুর্খ তাকে কেন মানবো? তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, তাহলে তোমরা মানো কাকে? তারা বলবে, আমরা মানি হুমায়ুন আজাদ উরফে মুসলমানের ঘরে টাটকা বেজাত, এরপর শাহরীযার কবীর, জাফর ইকবাল প্রমুখকে। তাহলে চলুন দেখি তাদের শিক্ষা আর আমার নবীর শিক্ষায় পার্থক্য কেমন দেখি।

১. এদের শিক্ষকের বাড়ি বাংলাদেশে, যারা সৃষ্টি। আর আমার নবীর শিক্ষক দুনিয়ার কোনো সৃষ্টি নয়। খোদ নবীজি সা. বলেছেন,

وإنِّي واللهِ لا أعلَمُ إلا ما علَّمني اللهُ

“আল্লাহর কসম, আমি যা জানি সব আমার আল্লাহ আমাকে শিখিয়েছেন।
সূত্র: যাদুল মা’আদ পৃ: ৪৭৬

অর্থাৎ আমার শিক্ষক দুনিয়ার কোনো মানুষ নন, বরং আমার শিক্ষক এই সাত তবক যমীন-আসমানের শ্রষ্টা মহান আল্লাহ। বলুন ছাত্র হিসাবে কে দামী? এরা না নবী? নিশ্চয় নবী।

২. দুনিয়ার ছাত্ররা শিক্ষকের কাছে শিক্ষা অর্জন করে, কিন্তু অনেকে ভদ্রতা শিখায় না। ফলে এরাই টিএসসির মোড়ে ছাত্রীদের ওড়না ধরে টানাটানি করে, ধর্ষণ করে সেঞ্চুরি করে। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবিবকে শুধু শিক্ষা দিয়ে ক্ষ্যান্ত হননি, বরং নবীজি বলেন,

أدَّبَني ربِّي فأحسنَ تأديبي

“আমার শিষ্টাচার বা ভদ্রতাও সুন্দরভাবে শিখিয়েছেন আমার রব আল্লাহ।
সূত্র: জামে সগীর হাদিস: ৩০৯

২. এরা যাদেরকে মানে সেসব শিক্ষিতরাা কেমন যোগ্য? এদের কেউ আর্টসের ছাত্র,কেউ সাইন্স নিয়ে পড়েছেন, কেউ বা ব্যবসায়, কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বাংলায় পিএসডি করে, কেউ ইংলিশে। যিনি যে বিষয়ে পিএসডি করেন, সে বিষয়ে পাকা হলেও অন্য বিষয়ে বেশ কাচা। যেমন যারা জেনারেল শিক্ষিত, তাদের সামনে বুখারী পড়াতে দিলে পায়জামা খুলে দৌড় দেবে। আমার এক মুসল্লিকে একদিন ইকামত দিতে বলেছিলাম। বেচারা ইকামাত দিচ্ছে এইভাবে,
আল্লাহুয়াকবার, আল্লাহুয়াকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ…. কাদকামাতারিস সালাহ, কাদকামাতারিস সালাহ।

আমাদের দেশের এক নেতা কিছুদিন আগে বলেছিলেন, “তোমরা হুজুর হইছো,তোমাদের শিক্ষকরা তোমাদের পিটায়া পিটায় আলেম বানাইছে, আর আমি ঘরে বসে বসে একাই শিখছি, আলিফ, বা, তা, ছা, জিম, হা, খা। উনি খা শিখছে।

বুঝাতে চাচ্ছি, যারা বাংলায় পন্ডিত তারা আরবীতে কাচা, আবার যারা ইনলিশে পিএসডি করা, তারা অনেকে বাংলায় এমনভাবে কথা বলে, বুঝার কায়দা থাকে না বাঙ্গালী নাকি রোহিঙ্গা। এক কথায় পৃথিবীর সব শিক্ষিত মানুষ কেউ সব বিষয়ে পারদর্শী নয়।

কিন্তু আপনার আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. কেমন শিক্ষিত ছিলেন? নবীজি সা. বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে শুধু এক বিষয়ের জ্ঞান দান করেননি, বরং
হযরত আব্দুল্লাহ বিন সালাম রা. মুসলিম হওয়ার আগে অসংখ্য প্রশ্ন করে সব সত্য সত্য উত্তর পাওয়ার পর নবীজি সা. কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন,

صدقت يا محمد لقد أوتيت علوم الأولين والآخرين

অর্থাৎ হে মুহাম্মাদ, তুমি সত্যই বলেছো। অবশ্যই তোমাকে আগের
সূত্র: খরিদাতুল আজাইব পৃ: ২৪৭

شرح صدره عليه السلام، حتى وسع علوم الأولين والآخرين
অর্থাৎ নবীজির বুকটা আল্লাহ তা’য়ালা এমন প্রশস্ত করে দিয়েছেন যে,তাঁর কাছে পূর্বকার এবং পরের সকলের জ্ঞান স্পষ্ট হয়ে গেছে।
সূত্র: আদওয়াউল বায়ান খ: ৯ পৃ: ১৪৫

৩. অজানা জ্ঞান দান।

এরা তো যে বিষয়ে লেখাপড়া করে, শুধু সে বিষয়ে পন্ডিত। কিন্তু নবীজি সা. এর ব্যাপারে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَأَنزَلَ اللّهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا

অর্থ: আল্লাহ আপনার প্রতি ঐশী গ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম।
সূত্র: সুরা নিসা আয়াত: ১১৩

৪. তোমাদের শিক্ষকরা তোমাদের কি পড়ায়? এরা পড়ায় হাট্রিমা টিম টিম, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, তাদের খাঁড়া দুটো শিং, তারা হাট্রিমা টিম টিম। ওরা বোঝে ঘোড়ার ডিম।

বলেন তো, যার মাথায় শিং আছে, তারা কি ডিম পাড়ে? নিশ্চয় না। তাহলে বোঝা গেল এ পড়াটা সত্য নয়। এক কথায় এদের শিক্ষকরা সত্যও পড়ায়, মিথ্যাও পড়ায়। কিন্তু নবীজির শিক্ষা কেমন? আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى

অর্থ: এবং তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। কোরআন ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।
সুরাঃ নাজম আয়াত: ৩-৪

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

ذَلِكَ الْكِتَابُ لاَ رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

অর্থ: এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য।
সুরাঃ বাকারা আয়াত: ২

৫. অনেকে বলতে পারেন, তিনি কোন দেশে পিএসডি করতে গেছেন? এরা তো কেউ যায় জাপান, লন্ডন,চায়না, মাথা খারাপ ডোবাল ট্রাম্পের আমেরিকা আর গরুর মূত খাওয়া দেশ ইন্ডিয়ায়। তবে আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. কে পড়ার জন্য আল্লাহ তা’য়ালা নিয়েছেন, আরশে।

سُبۡحٰنَ الَّذِیۡۤ اَسۡرٰی بِعَبۡدِهٖ لَیۡلًا مِّنَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ اِلَی الۡمَسۡجِدِ الۡاَقۡصَا الَّذِیۡ بٰرَکۡنَا حَوۡلَهٗ لِنُرِیَهٗ مِنۡ اٰیٰتِنَا ؕ اِنَّهٗ هُوَ السَّمِیۡعُ الۡبَصِیۡرُ

অর্থাৎ পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
সুরাঃ বনী ইসরাঈল আয়াত: ১

অর্থাৎ তিনি আরশে আজীমে পিএসডি করে এসেছেন।

তিনি ছাত্রদের কাছে কেমন যোগ্য ছিলেন?

বর্তমানে যত বড়ই শিক্ষক হোক না কেন, কোনো ছাত্র বুকে হাত রেখে বলতে পারবে না যে, আমার শিক্ষক যোগ্যতায় এবং দায়িত্ব পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছেন। যেমন রবী ঠাকুরের অনুসারীদের কাছে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কি কবিতার জগতে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছেন? তারা বলবে, নিশ্চয় না। যদি পারতেন তাহলে এখন আর নতুন কবিতা লেখার দরকার ছিল না। হুমায়ুন আহমেদের ছাত্ররাও একই জবাব দেবে যে, বাংলা সাহিত্যে তার পূর্ণতা অর্জিত হয়নি, বরং আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে আরও কিছু দিতে পারতেন?

কিন্তু বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে রা. জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, আমি আমার দায়িত্ব কি পরিপূর্ণ ভাবে তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি? প্রতিউত্তরে সাহাবায়ে কেরাম বললেন-

قالوا نشهدُ أنَّكَ قد بلَّغتَ وأدَّيتَ ونصحْتَ ثمَّ قالَ بأُصبعِهِ السَّبَّابةِ يرفعُها إلى السَّماءِ وينكبُها إلى النَّاسِ اللَّهمَّ اشهدْ اللَّهمَّ اشهدْ اللَّهمَّ اشهدْ

অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম বললেন অামরা সাক্ষী দিচ্ছি অাপনি অবশ্যই আপনার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পৌঁছে দিয়েছেন এবং আদায় করেছেন এবং উপদেশ দিয়েছেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম তার শাহাদাত আঙ্গুল উঁচিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করে বললেন যে, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। তুমি সাক্ষী থাকো। তুমি সাক্ষী থাকো।
সূত্রঃ সহিহ মুসলিম হাদিস-১২১৮ আবু দাউদ হাদিস-১৯০৫ ইবনে মাযাহ হাদিস-৩০৭৪ নাসাঈ হাদিস-৬৫৬

Check Also

ইশকে সাহাবা রা.

  বেলাল রা. فمر به أبو بكر رضي الله تعالى عنه وقد أخذه أمية أبو …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *