অন্যান্য ধর্মে বাল্যবিবাহ।

হিন্দুধর্মীয় গ্রন্থে বিয়ের বয়সসীমা:

হিন্দুধর্মে পাত্রপাত্রীর বয়সসীমা কত হবে সেটা সুস্পষ্টভাবে তারা তাদের বইয়ে লিখেছেন। তাদের ধর্মীয়গ্রন্থে বলা আছে এভাবে,

‘ত্রিশ বৎসর-বয়স্ক পুরুষ দ্বাদশবর্ষীয়া কন্যাকে বিবাহ করিবে, চতুর্ব্বিংশতিবর্ধবয়স্ক ব্যক্তি অষ্টম-বর্ষীয়া কন্যা বিবাহ করিবে, ইহা দ্বারা বিবাহযোগ্যকাল প্রদর্শিত হইল মাত্র। তিনগুনে অধিকবয়স্ক পুরুষ একগুনবয়স্কা কন্যাকে বিবাহ করিবে। ইহার ন্যূনাধিকে বিবাহ করিলে ধর্ম্ম নষ্ট হয়।’
সূত্র: মনুসংহিতা অধ্যায়. ৯ শ্লোক. ৯৪ পৃ. ৪০২

অর্থাৎ ৩০ বছর বয়সের পুরুষ ১২ বছর বয়সের মনোমত কন্যাকে বিবাহ করবে, অথবা ২৪ বছর বয়সের পুরুষ ৮ বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। এর দ্বারা বিবাহযোগ্য কাল প্রদর্শিত হ’ল মাত্র। তিন গুণের বেশি বয়সের পুরুষ, একগুণ বয়স্কা কন্যাকে বিবাহ করবে এরকম বেশি বয়সে বিবাহ করলে ধর্ম নষ্ট হবে।

সুতরাং বুঝা গেলো, হিন্দু ধর্মে ৮ বছরের মেয়েও বিবাহ বৈধ।

হিন্দুদের দেবতা রামের বিয়ের সময় তার স্ত্রীর বয়স:

রাম (সংস্কৃত: राम) হলেন হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। হিন্দু ধর্মগ্রন্থগুলিতে তাকে অযোধ্যার রাজা বলা হয়েছে। বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম হিন্দুধর্মে তিনি একজনজনপ্রিয় দেবতা।ভারত এবং নেপাল ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে রাম এর পূজা প্রচলিত আছে। এই রামচন্দ্র যখন সীতাকে বিবাহ করেন, তখন সীতার বয়স ছিলো মাত্র ৬ বছর। চলুন এ সম্পর্কে দুটি প্রমাণ পেশ করছি।

প্রমাণ: ১

এ ব্যাপারে স্পষ্ট করে কলকাতার হিন্দুদের বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিষ্ট শুভাশিস মৈত্র ‘রাবণের আগে প্রথম সীতাহরণের কাহিনি’ শিরোনামে ‘মাসিক বঙ্গদর্শনে’ লিখেছেন এভাবে,
‘সীতার যখন রামের সঙ্গে বিয়ে হল, তখন সীতার বয়স ৬ এবং রামের ১৩। আর যখন রাম বনবাসে যাচ্ছেন, তখন সীতা ১৮, রামের বয়স ২৫।’
সূত্র: মাসিক বঙ্গদর্শন ২৯ জুলাই, ২০১৭

প্রমাণ: ২

বাল্মীকি রামায়ণ অরণ্যকান্ড অধ্যায়ে রাম ও সীতার ইতিহাস বিস্তারিতভাবে লেখা রয়েছে। সেখানে এক পর্যায়ে বনবাসের পর সীতাকে রাবন হরণ করার আগে রাবন সীতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সীতা জবাব দেয় এই বলে যে,

‘ব্রহ্মণ, আমি মিথিলাধিপতি মহাত্মা জনকের কন্যা, রামের সহধর্মিনী নাম সীতা, আমি বিবাহের পর স্বামীগৃহে দিব্য সুখসম্ভোগে দ্বাদশ বৎসর অতিবাহন করি।’

‘তখন (বনবাসের সময়) রামের বয়ঃক্রম পঞ্চবিংশতি এবং আমার অষ্টাদশ।’
সূত্র: বাল্মীকি রামায়ণ অরণ্যকান্ড অধ্যায়. ১৩ সর্গ. ৪৭ শিরোনাম: সীতাহরণ পৃ. ৩৭৬

অর্থাৎ বিয়ের পর ১২ বছর সংসারে থাকার পর রাম-সীতা বনবাসে গেলেন। বনবাসের সময় রামের বয়স ২৫ আর সীতার বয়স ১৮।  ফলাফল হলো বনবাসের আগের সাংসারিক ১২ বছর বাদ দিলে, তাদের বিবাহের সময়ের বয়স দাঁড়ায়,
রামের বয়স ২৫-১২= ১৩ বৎসর বছর,
সীতার বয়স দাঁড়ায় ১৮-১২= ৬ বছর।

যদিও এ তথ্যটি হিন্দু সম্প্রদায় অস্বীকার করে বলেন, যে রামের বয়স বিয়ের সময় ছিলো ২৫ বছর আর সীতার বয়স ছিলো ১৮ বছর। কিন্তু তাদের এ গবেষণাটি ভুল। কারণ:

১. যদি কোনো হিন্দু আমার এ দাবি মিথ্যা প্রমাণ করতে চান, তাহলে আমি বলবো, তাদের ‘বাল্মিকী রামায়ণ’ নামক ধর্মগ্রন্থটি মিথ্যা। এখন কেউ কি নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ধর্মগ্রন্থকে বানোয়াট প্রমাণ করার মত দু:সাহস করবেন?

২. তাদের ধর্মীয় বিধান হলো, ৩০ বছর বয়সের পুরুষ ১২ বছর বয়সের মনোমত কন্যাকে বিবাহ করবে, অথবা ২৪ বছর বয়সের পুরুষ ৮ বছরের কন্যাকে বিবাহ করবে। এর দ্বারা বিবাহযোগ্য কাল প্রদর্শিত হ’ল মাত্র। তিন গুণের বেশি বয়সের পুরুষ, একগুণ বয়স্কা কন্যাকে বিবাহ করবে এরকম বেশি বয়সে বিবাহ করলে ধর্ম নষ্ট হবে।
সূত্র: মনুসংহিতা অধ্যায়. ৯ শ্লোক. ৯৪ পৃ. ৪০২

তাহলে বিবাহের সময় রামচন্দ্রের বয়স ২৫ আর সীতার ১৮ বলে যে কথার দাবি তারা করতে চায়, এর ফলে তো তাদের ধর্মীয় আইন অনুযায়ী রামচন্দ্র ধর্ম নষ্ট করেছেন বলে প্রমাণ হবে। কি আশ্চর্য ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

সুতরাং ৬ বছরের বাচ্চাশিশু বিবাহ করা ও পানিগ্রহণের পরেও রামচন্দ্র হয়ে গেলের মহাপুজণীয় দেবতা। আর মুহাম্মাদ সা. ৯ বছরের আয়েশার রা. সাথে সংসার করলে হয়ে গেলেন নিন্দনীয়। আসলে চোখে বিদ্বেষের চাহুনী থাকলেই এভাবে বিরোধীতা করা যায়। তবে নবীজিকে সা. নিয়ে তাদের এ সমালোচনা নিছক বিরোধিতার ফসল বৈ কি?

হিন্দুধর্মের কয়েকজন মনিষীর স্ত্রীর বিবাহের সময় বয়স:

১. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও দীনময়ী:

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন দীনময়ী দেবীকে বিয়ে করেন, তখন দীনময়ীর বয়স ছিলো মাত্র ৮ বছর।

এ সম্পর্কে ‘ঈশ্বরের উত্তরণে দীনময়ীর একলা যাপন অন্তরালেই’ শিরোনামে আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছে,

‘১৮৩৪-এর ফাল্গুনের জ্যোৎস্না প্লাবিত যে রাতে মেঘেরা চন্দ্রাভিসারে চলেছিল, আর ঈশ্বরচন্দ্র চলেছিলেন দীনময়ী নাম্নী অষ্টমবর্ষীয়া এক বালিকার পুতুলখেলা অপুষ্ট হাতে পানিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি তুলে দিতে— সে রাতের কথা জীবনে আর কী কখনও তাঁর স্মৃতির পাতায় ভিড় করেছিল? না করারই কথা। কারণ তিনি তখন চোদ্দো বছরের কিশোর।’
সূত্র: দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

২. সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী:

সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জ্ঞানদানন্দিনীকে বিয়ে করেন, তখন জ্ঞানদানন্দিনীর বয়স ছিলো মাত্র ৭ বছর।

এ সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য সূত্র উইকিপিয়াতে লেখা রয়েছে এভাবে,

‘সে সময়কার রীতি অনুসারে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর বিয়ে হযে যায় খুবই অল্পবয়সে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় পুত্র সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ১৮৫৭ সালে যখন তার যখন বিয়ে হয় তখন সে সাত বছরের শিশু।’
সূত্র: উইকিপিডিয়া

৩. বঙ্কিমচন্দ্র ও মোহিনী দেবী:

বঙ্কিমচন্দ্র যখন মোহিনী দেবীকে বিয়ে করেন, তখন মোহিনী দেবীর বয়স ছিলো মাত্র ৫ বছর।

এ সম্পর্কে ‘মেয়ে খুন, তবু পুলিশ ডাকেননি বঙ্কিমচন্দ্র’ শিরোনামে আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয়েছে,
‘বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম স্ত্রী মোহিনী দেবী। বিয়ের সময় বঙ্কিমের বয়স ছিল দশ বছর আর মোহিনীর পাঁচ।’
সূত্র: দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা ১৮ এপ্রিল ২০২১

উইকিপিডিয়া আসছে এভাবে,
‘বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বিয়ে হয় ১৮৪৯ সালে। তখন তার বয়স ছিলো মাত্র ১১ বছর। নারায়নপুর গ্রামের এক পঞ্চমবর্ষীয়া বালিকার সাথে তার বিয়ে হয়।’
সূত্র: উইকিপিডিয়া

৪. জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও কাদম্বরী:

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন কাদম্বরীকে বিয়ে করেন, তখন কাদম্বরীর বয়স ছিলো মাত্র ৯ বছর।

এ সম্পর্কে উইকিপিডিয়াতে এভাবে লেখা রয়েছে,
‘মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯ বছর বয়সী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে কাদম্বরীর বিয়ে হয়।’
সূত্র: উইকিপিডিয়া।

৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মৃণালিনী দেবী বা ভবতারিণী:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন মৃণালিনী দেবী বা ভবতারিণীকে বিয়ে করেন, তখন মৃণালিনী দেবীর বয়স ছিলো মাত্র ১০/১১ বছর।

এ সম্পর্কে উইকিপিডিয়া লেখা রয়েছে,
মৃণালিনী দেবী বা ভবতারিণীর ১৮৭৩ সালে জন্ম হয়। আর রবীন্দ্রনাথের সাথে ১৮৮৩ সালে বিয়ে হয়। অর্থাৎ বিয়ের সময় মৃণালিনী দেবীর বয়স ছিলো ১০/১১ বছর।
সূত্র: উইকিপিডিয়া

খ্রিষ্টান ধর্মে মেয়েদের প্রাপ্তবয়সের সময়:

নেইল পোস্টম্যানের লেখা দ্যা ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স অব চাইল্ডহুড নামক গ্রন্থে আমরা দেখি যে মধ্যযুগে খ্রিস্টিয়ান চার্চ মাত্র ৭ বছর বয়সকে ধরত প্রাপ্তবয়স্কতার বয়স হিসেবে।
সূত্র: উইকিপিডিয়া।

নাস্তিক্যবাদ ও বৈধ যৌনাচার:

নাস্তিকগুরু হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন,

‘নৈতিকতার সীমা হওয়া উচিত সংকীর্ণ, আমার কোন কাজ যেন অন্যকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে।’
সূত্র: আমার অবিশ্বাস পৃ. ১৪৩

অর্থাৎ নৈতিকতার পরিচয় হলো, কারো ক্ষতি না করা। তাহলে প্রশ্ন হলো, নবীজির সা. সাথে আম্মাজান আয়েশার রা. বৈবাহিক সম্পর্কে কারো কোনো ক্ষতি হয়েছিলো কি? নিশ্চয় না। তাহলে সে বিষয়ে প্রশ্ন করা কোনো নাস্তিকের জন্য কোন নৈতিকতার কর্ম? সুতরাং নাস্তিকদের জন্যও নবীজির সা. আয়েশাকে রা. বিয়ে করা কোনো অনৈতিক বিষয় ছিলো না।

Check Also

আয়েশা রা. পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published.