হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. এর বিয়ে পর্যালোচনা।

হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. এর সংক্ষিপ্ত  পরিচিতি।

হযরত যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. ছিলেন রাসূল সা. এর ফুফাতো বোন। তাঁর মা ছিলেন উমায়মা বিনতে আবদুল মুত্তালিব। যিনি কুরাইশ গোত্রের হাশিম বংশের সদস্য এবং মুহাম্মদ সা. এর বাবা আব্দুল্লাহর আপন বোন। হযরত যায়নাব রা. নবীজির সা. সাথে মাদীনায় হিজরত করেন। নবীজি সা. তাঁর আযাদকৃত দাস এবং একসময়কার পালকপুত্র যায়েদ বিন হারেছার রা. সাথে বিবাহ দেন।

অত:পর যায়েদ রা. তাঁকে তালাক দিলে আল্লাহর নির্দেশে তাঁকে বিবাহ করেন।

যায়েদের রা. সাথে যায়নাবের রা. বিবাহ:

হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত উসমান জাহাশী রা. বলেন,

قَدِمَ النَّبيُّ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ المدينةَ، وكانت زَينبُ بنتُ جَحْشٍ ممَّن هاجَرَ معَ رسولِ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ وكانتِ امرأةً جميلةً، فخَطَبَها رسولُ اللهِ صلّى اللهُ عليه وسلَّمَ على زَيدِ بنِ حارثةَ، فقالتْ: يا رسولَ اللهِ، لا أرضاهُ لنَفْسي، وأنا أَيِّمُ قُرَيْشٍ، قالَ: فإنِّي قد رَضِيتُهُ لكِ، فتزوَّجَها زَيْدُ بنُ حارثةَ

অর্থাৎ যখন রাসুলুল্লাহ সা. মদীনায় আগমন করলেন, সে সময় তাঁর সাথে যায়নাব বিনতে জাহাশও নবীজির সা. সাথে হিজরত করে এসেছিলেন। তিনি অত্যন্ত সুন্দরী নারী ছিলেন। নবীজি সা. তাঁকে যায়েদ ইবনে হারেসার রা. সাথে তাঁর বিয়ের জন্য তাকে প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার জন্য তাঁকে পছন্দ করছি না। কারণ আমি কোরাইশী। নবীজি সা. বললেন, আমি তোমাকে তার জন্য মনোনীত মনে করি। অতঃপর যায়েদের রা. সাথে তাকে বিয়ে দিলেন।
সূত্র: মুসতাদরাক আলাস সাহিহাইন হাদিস: ৬৯৫৪

যায়েদের রা. সাথে যায়নাবের রা. তালাক:

হযরত মুকাতিল ইবনে হায়্যান রহ. বলেন,

فَمَكَثْتُ عِنْدَهُ قَرِيبًا مِنْ سَنَةٍ أَوْ فَوْقَهَا، ثُمَّ وَقَعَ بَيْنَهُمَا، فَجَاءَ زَيْدٌ يَشْكُوهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ

অর্থাৎ যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. যায়েদ রা. এর কাছে এক বছর বা এর কিছু বেশিদিন সংসার করেছিলেন। অতপর তাঁদের মাঝে মনোমালিন্যতা তৈরি হলে যায়েদ রা. নবীজির সা. কাছে এসে অভিযোগ করলেন।
সূত্র: আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ খ. ৬ পৃ. ১৫০

অপর আরেকটি হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَنَسٍ قَالَ جَاءَ زَيْدُ بْنُ حَارِثَةَ يَشْكُو فَجَعَلَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ اتَّقِ اللهَ وَأَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ

অর্থাৎ হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়দ ইবনু হারিসা রা. অভিযোগ নিয়ে আসলেন। তখন তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলতে লাগলেন, তুমি আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪২০

কিন্তু তাঁদের মাঝে বনিবনা না হওয়ার এক পর্যায় যায়েদ রা. তাঁকে তালাক দিয়ে দিলেন।

এখানে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা উচিৎ-
১. যায়নাবকে রা. তালাক দিতে নবীজি সা. যায়েদ রা. কে আদেশ করেননি, বরং তিনি নিজেই তাঁর ব্যক্তিগত কারণে তালাক দিয়েছেন। এখানে নবীজির সা. সমালোচনা করার মত কোনো কারণ ছিলো না।
২. ‘নবীজি সা. যায়নাবের রা. প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন’ এমন কোনো কথা, ইঙ্গিত বা আচরণ নবীজির সা. থেকে হযরত যায়েদ রা. দেখেননি।

বিয়ের আগেই নবীজিকে সা. বিয়ের বিষয়টি আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছিলেন।

নবীজি সা. কে আল্লাহ তা’আলা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, হযরত যায়নাবকে রা. তাঁর স্ত্রী বানাবেন। কিন্তু তিনি সেটা প্রকাশ করেননি। এজন্য খোদ আল্লাহ তা’আলা নবীজিকে সা. বললেন,

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ

অর্থাৎ আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত।
সুরা আহযাব, আয়াত: ৩৮

বুঝা গেলো, নবীজির স্ত্রী যায়নাব রা. হবেন, এটা নবীজিকে সা. আল্লাহ তা’আলা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন।

অভিযোগ:

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন যে, নবীজি সা. যদি জানতেন যে, যায়নাবের রা. বিয়ে নবীজির রা. সাথেই আল্লাহ করাবেন, তাহলে তিনি কিভাবে বললেন যে, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও?

জবাব:

এক.
আল্লাহ তাা’য়ালা জানতেন যে এ বেঈমানরা ঈমান আনবে না। তারপরও আল্লাহ ঈমান আনার কথা কেন বললেন?

দুই.
অন্যের স্ত্রীকে নবীজি সা. ছেড়ে দিতে কেন বলবেন? যেহেতু আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা হলো যায়নাবকে রা. নবীজির সা. স্ত্রী বানাবেন। সুতরাং আল্লাহই এর ব্যবস্থা করে দেবেন। এ বিষয়ে নবীজির সা. পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো।

তিন.
এটা তো নবীজির সা. অপরাধ ছিলো না, বরং তাঁর মহানুভবতা ছিলো। কারণ তিনি যায়েদের রা. চেয়ে নিজেকে প্রাধান্য দেননি।

নবীজির সা. সাথে যায়নাবের রা. বিবাহ:

অতপর যায়নাব রা. এর যখন ইদ্দত পালন শেষ হলো তখন নবীজি সা. তাঁকে বিয়ে করলেন। মহান আল্লাহ বলেন,

وَإِذْ تَقُولُ لِلَّذِي أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَأَنْعَمْتَ عَلَيْهِ أَمْسِكْ عَلَيْكَ زَوْجَكَ وَاتَّقِ اللَّهَ وَتُخْفِي فِي نَفْسِكَ مَا اللَّهُ مُبْدِيهِ وَتَخْشَى النَّاسَ وَاللَّهُ أَحَقُّ أَن تَخْشَاهُ فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

অর্থাৎ আল্লাহ যাকে অনুগ্রহ করেছেন; আপনিও যাকে অনুগ্রহ করেছেন; তাকে (যায়েদকে) যখন আপনি বলেছিলেন, তোমার স্ত্রীকে তোমার কাছেই থাকতে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর। আপনি অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ পাক প্রকাশ করে দেবেন। আপনি লোকনিন্দার ভয় করেছিলেন। অথচ আল্লাহকেই অধিক ভয় করা উচিত। অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে
সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭

এজন্য এ স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে হযরত আনাস রা. বলেন,

لَوْ كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم كَاتِمًا شَيْئًا لَكَتَمَ هَذِهِ

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কোন জিনিস গোপন করতেন, তাহলে এ আয়াতটি অবশ্যই গোপন করতেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪২০

এজন্য নবীজির সা. সাথে আম্মাজান হযরত যায়নাবের রা. বিয়ের সৃতিচারণ করতে গিয়ে আম্মাজান যায়নাব রা. বলতেন,

قَالَ فَكَانَتْ زَيْنَبُ تَفْخَرُ عَلَى أَزْوَاجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم تَقُولُ زَوَّجَكُنَّ أَهَالِيكُنَّ وَزَوَّجَنِي اللهُ تَعَالَى مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَوَاتٍ

অর্থাৎ বর্ণনাকারী বলেন, (যাইনাব (রাঃ) অপরাপর নবী অন্যান্য কাছে এ বলে গর্ব করতেন যে, তোমাদেরকে বিয়ে দিয়েছে তোমাদের পরিবার-পরিজন, আর আমাকে স্বয়ং আল্লাহ্ তা’আলা সাত আসমানের ওপরে বিয়ে দিয়েছেন।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ৭৪২০

ইমাম শা’বী রহ. বলেন, হযরত আম্মাজান যায়নাব রা. নবীজিকে সা. বলতেন,
: إني لأدل عليك بثلاث ما من نسائك امرأة تدل بهن إن جدي وجدك واحد ، وإني أنكحنيك الله من السماء ، وإن السفير لجبرائيل عليه السلام .

অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা আমার মধ্যে এমন তিনটি বিশেষত্ব রেখেছেন, যা আপনার অন্যান্য স্ত্রীদের মাঝে নেই।
১. আমার নানা ও আপনার দাদা একই ব্যক্তি।
২. আপনার সাথে আমার বিয়ে আল্লাহ তা’আলা আকাশে পড়িয়েছেন।
৩. আমাদের মাঝে সংবাদ-বাহক ছিলেন হযরত জিবরাইল আ.।

সুতরাং প্রমাণ হলো, নবীজির সা. সাথে আম্মাজান যায়নাবের রা. বিয়ের বিষয়টি ছিলো সরাসরি আল্লাহ তা’আলা এবং ফিরিস্তাদের মাধ্যমে। যদিও এটা উম্মতের কারো জন্য এভাবে বিয়ে বৈধ নয়। কারণ নবীজির সা. জন্য কিছু বিষয় ছিলো স্পেশাল ছাড়।

নাস্তিকের একটি অভিযোগ ও তার জবার:

মহান চরিত্রের অধিকারী নবীজি সা. কে নিয়ে নাস্তিকরা সামলোচনার জায়গা খুঁজে না পেয়ে, কিছু অহেতুক প্রশ্ন ছুড়ে দেন। আম্মাজান যায়নাব বিনতে জাহাশ রা. কে কেন্দ্র করে তারা একটি জলঘোলা করতো চেষ্টা করে যাচ্ছি অবিরত। মূলত তাবারী রহ. এর একটি বর্ণিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তারা এই হীনপ্রচেষ্টায় নির্লিপ্ত হয়েছে। চলুন আগে ঘটনাটি দেখে নেয়া যাক। তারপর পর্যালোচনাটি দেখবো।

ইবনে জারীর তাবারী (রহঃ) তাঁর তাফসীরে উল্লেখ্য করেন,

حدثني يونس، قال: أخبرنا ابن وهب، قال: قال ابن زيد: كان النبي ﷺ قد زوج زيد بن حارثة زينب بنت جحش، ابنة عمته، فخرج رسول الله ﷺ يومًا يريده وعلى الباب ستر من شعر، فرفعت الريح الستر فانكشف، وهي في حجرتها حاسرة، فوقع إعجابها في قلب النبي ﷺ، فلما وقع ذلك كرِّهت إلى الآخر فجاء فقال: يا رسول الله إني أريد أن أفارق صاحبتي، قال: ما ذاك، أرابك منها شيء؟ “قال: لا والله ما رابني منها شيء يا رسول الله، ولا رأيت إلا خيرًا، فقال له رسول الله ﷺ: أمسك عليك زوجك واتق الله

অর্থাৎ ইউনুস বলেন, ইবনে ওহাস বলেন, ইবনে যায়েদ আমাকে বলেছেন, “রাসূল ﷺ যায়েদ বিন হারেছা রা. নবীজির সা. ফুফাতো বোন যায়নাবকে রা. বিয়ে করেছিলেন। একদিন যায়েদকে রা. খুঁজতে তাঁর বাসায় গেলেন। তাঁর বাসায় পশমের পর্দা টানানো ছিলো, কিন্তু ঘটনাক্রমে বাতাসে পর্দাটা সরে গেলে যায়নাবের রা. দিকে নবীজির দৃষ্টি পড়ে যায়। এমতাবস্থায় যে, যায়নাব রা. তখন পোষাকহীন ছিলেন। ফলে যায়নাবের রা. সৌন্দর্য দেখে নবীজির সা. হৃদয়ে আকর্ষণ সৃষ্টি হলো। সাথে সাথেই নবীজি সা. তাঁর চেহারা মোবারক অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। অতপর যায়েদ রা. নবীজির সা. কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিতে চাচ্ছি। নবীজি সা. বললেন, কেন? তুমি তাঁকে কি সন্দেহ করো? যায়েদ রা. বললেন, না। হে আল্লাহর নবী, আমার মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হয়নি, বরং আমি তাঁর মাঝে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু দেখিনি। নবীজি সা. বললেন, স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো।
সূত্র: তাফসীরে তাবারী খ. ২০ পৃ. ২৭৩

প্রিয় পাঠক, উক্ত বর্ণনার ধরণ দেখলেই বুঝা যায়, এটি কোনো সহিহ হাদিস নয়। হ্যাঁ। এটাই সত্য। কারণ-

এক.
উক্ত বর্ণানটা যিনি বর্ণনা করেছেন, তিনি হলেন, ইবনে যায়েদ। আর তাফসীরের ক্ষেত্রে ইবনে যায়েদ বলতে আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ ইবনে আসলামকে বুঝানো হয়। আর এই আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদের ব্যাপারে ‘দুর্বল বর্ণনাকারী’ বলা হয়েছে।

عَن يَحْيى، قال: أسامة، وَعَبد الله، وَعَبد الرحمن بني زيد بن أسلم يعني ضعفاء

অর্থাৎ ইমাম ইয়াহইয়া রহ. বলেন, যায়েদ ইবনে আসলামের সন্তানত্রয় ১. উসামা, ২. আব্দুল্লাহ ৩. আব্দুর রহমান সবাই দুর্বল রাবী।
সূত্র: আল কামিল ফি যুআফাইর রিজাল খ. ৫ পৃ  ৪৪১

ইমাম সা’দী রহ. বলেন,

قال السعدي بنو زيد بْن أسلم أسامة، وَعَبد اللَّه، وَعَبد الرَّحْمَنِ ضعفاء في الحديث

অর্থাৎ যায়েদ ইবনে আসলামের সন্তানত্রয় ১. উসামা, ২. আব্দুল্লাহ ৩. আব্দুর রহমান সবাই হাদিসের ক্ষেত্রে দুর্বল রাবী।
সূত্র: আল কামিল ফি যুআফাইর রিজাল খ. ৫ পৃ  ৪৪১

দুই.
দ্বিতীয় কারণ হলো, তিনি নবীজির সা. ইন্তেকালের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করেছেন। কারণ তার মৃত্যু হয়েছে,

توفي سنة اثنتين وثمانين ومائة

অর্থাৎ তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন ১৮২ হিজরীতে। তাহলে তিনি কিভাবে বিষয়টি দেখেছিলেন? পাশাপাশি তিনি কার থেকে এটা বর্ণনা করেছেন সেটাও জানা যায়নি।

এ ঘটনা সম্পর্কে আরও যত বর্ণনা রয়েছে, সবগুলোই দুর্বল সনদে উল্লেখ্য করা হয়েছে। সুতরাং এ ঘটনাটি দিয়ে নবীজিকে সা. সমালোচিত করে মুর্খরা।

তিন.
যদিও ধরে নেই সে হাদীস নির্ভরযোগ্য, তবুও রাসূল সা. এর হঠাৎ যয়নাবের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়াটা অবাস্তব। কারণ, যয়নাব রা. ছিলেন রাসূল সা. এর ফুফাতো বোন। রাসূল সা. তাঁর রূপ, গুণ সম্পর্কে বহু পূর্বে অবগত ছিলেন।

চার.
উপরন্তু যদি ঘটনাটি সত্যিও হয়, তবুও আপত্তির জায়গা কোথায়? কারণ পুরুষ হিসাবে নবীজির সা. মনে আসক্তি তৈরি হতেই পারে। কিন্তু তিনি কি সীমালঙ্ঘন করেছিলেন? নিশ্চয় না। কারণ উক্ত ঘটনাটার মাঝে এটাও বর্ণিত রয়েছে যে, ‘তিনি সাথে সাথেই অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তিনি তো কোনো অপরাধে জড়াননি, বরং অন্য আরেকটি বর্ণনাতে এসেছে, যায়নাব রা. নবীজি সা. বসার জন্য ঘরে প্রবেশ করার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি। তাহলে এটা কি নবীজির সা. চরিত্রের মাধুর্যতা প্রকাশ পায় না? এটা নিয়ে তো সমালোচনা না করে বরং প্রশংসা করা  দরকার ছিলো।

পাঁচ.
রাসুলুল্লাহ সা. যদি যায়নাবের রা. প্রতি আকৃষ্ট থাকতেন, তাহলে যায়েদ রা. যখন তাঁকে তালাক দিতে চাইলেন, তখন নবীজি সা. তালাক দিতে না বলে ‘স্ত্রীকে তোমার কাছে রেখে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো।’ এটা কেন বললেন? সমালোচনা খোঁজার জায়গা কি আর পায়নি নাস্তিকরা? কতবড় এক চোখা ওরা ভেবে দেখুন তো।

ছয়.
ঘটনাটি ঘটেছে যায়েদ রা. ও যায়নাব রা. এর সাংসারিক জিবন নিয়ে। কিন্তু তাঁদের দুজন কেউ বিষয়টি নিয়ে নবীজিকে সা. দোষারোপ করতে পারেননি, করেননি। কিন্তু নাস্তিকরা দোষ খুঁজে বের করে আসলে গাল বাড়িয়ে চড় খেতে আসলো না তো? অতএব বুঝে নিন, মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশী হলে যা হয় আর কি।

মুহাম্মাদ সা. কেন যয়নাব রা. কে বিয়ে করেছিলেন?

প্রিয় পাঠক, হযরত যায়েদ রা. খাদিজা রা. এর ক্রীতদাস ছিলেন, নবীজি সা. যখন আম্মচান খাদিজাকে রা. বিয়ে করলেন, তখন তাঁকে নবীজির সা. সেবা করার জন্য উপহার দেন। কিন্তু তাঁর চাল-চলন রাসূল সা. কে মুগ্ধ করে এবং তিনি তাঁকে মুক্ত করে দেন। তিনি ছিলেন রাসূল সা. এর পালকপুত্র আর সবাই তাকে ‘যায়েদ বিন মুহাম্মাদ’ বলে ডাকতো। আর তৎকালীন আরবে ‘পালকপ্রথা’র প্রচলন ছিলো। অর্থাৎ পালকপূত্রকে ঔরসজাত পূত্রের মত মনে করা হতো। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা পালক পুত্রের বিধান রহিত করে দিলেন এবং পিতৃ-পরিচয় জানার পরেও কাউকে ভিন্ন নামে ডাকতে নিষেধ করে ঘোষণা দিয়ে দিলেন,

مَّا جَعَلَ ٱللَّهُ لِرَجُلࣲ مِّن قَلۡبَیۡنِ فِی جَوۡفِهِۦۚ وَمَا جَعَلَ أَزۡوَ ٰ⁠جَكُمُ ٱلَّـٰۤـِٔی تُظَـٰهِرُونَ مِنۡهُنَّ أُمَّهَـٰتِكُمۡۚ وَمَا جَعَلَ أَدۡعِیَاۤءَكُمۡ أَبۡنَاۤءَكُمۡۚ ذَ ٰ⁠لِكُمۡ قَوۡلُكُم بِأَفۡوَ ٰ⁠هِكُمۡۖ وَٱللَّهُ یَقُولُ ٱلۡحَقَّ وَهُوَ یَهۡدِی ٱلسَّبِیلَ

অর্থাৎ আল্লাহ কোনো মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি। তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা যিহার করো, তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ ন্যায় কথা বলেন এবং পথ প্রদর্শন করেন।” সূরা আহযাব, আয়াত: ৪

আল্লাহ খুব সুন্দরভাবে আমাদের উপমা দিয়ে বোঝাচ্ছেন; যেভাবে মানুষের মধ্যে দুইটা মন থাকতে পারে না, যেমনিভাবে নিজেদের স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করলে তবে তারা আমাদের আসল মা হয়ে যায় না, স্ত্রীই থাকে। ঠিক একইভাবে কেউ পুত্র না হয়েই পুত্রের পরিচয় বহন করতে পারে না, এটা আমাদের মুখের কথা মাত্র এবং আমাদের মনের সাথে তার কোনো সংযোগ নেই। পরবর্তীতে রাসূল সা. আর যায়েদ রা. কে নিজের পুত্র হিসেবে সম্বোধন করেননি, বরং বলেছিলেন,

قالَ لِزَيْدٍ أنْتَ أخُونا ومَوْلانا

অর্থাৎ নবীজি সা. যায়েদকে রা. বললেন, তুমি আমাদের ভাই এবং বন্ধু।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ২৬৯৯

এ বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আল্লাহ তা’আলা নবীজির জন্য যায়নাবের রা. বিয়েটা করিয়েছেন। এটা নিন্মোক্ত আয়াত থেকেই বুঝা যায়। মহান আল্লাহ বলেন,

فَلَمَّا قَضَى زَيْدٌ مِّنْهَا وَطَرًا زَوَّجْنَاكَهَا لِكَيْ لَا يَكُونَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ حَرَجٌ فِي أَزْوَاجِ أَدْعِيَائِهِمْ إِذَا قَضَوْا مِنْهُنَّ وَطَرًا وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ مَفْعُولًا

অর্থাৎ অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করল, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আল্লাহর নির্দেশ কার্যে পরিণত হয়েই থাকে
সূরা আহযাব, আয়াত: ৩৭

এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা একেবারে পরিষ্কারভাবে বলেছেন, কেন আল্লাহ তা’আলা যয়নাব রা. কে রাসূল সা. এর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। যাতে পোষ্যপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করার মাধ্যমে ‘পালকপ্রথা’ চিরতরে দূর হয়ে যায়।

হ্যাঁ, অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, পালকপ্রথা তথা
পোষ্যপুত্র হিসেবে পিতার পরিচয় বহন করলে এমন কী সমস্যা? প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, ইসলাম একটি পুর্ণাঙ্গ জিবন ব্যবস্থা। যার সকল দিক খেয়াল করেই বিধান আরোপ করে।

প্রবলেমটা একটা দিক সামনে নিয়ে আলোচনা করা যাক। মনে করুন, ইসলামে পরনারীর সাথে বেপর্দার সাথে দেখা করা জায়েয নেই। এখন পিতার পরিচয় বহন করলেই যদি কেউ পিতা হয়ে যায়, তাহলে সে বাবার যদি কোনো সন্তান থাকে, তবে সে তাদের ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে।  এক্ষেত্রে, বিপরীত লিঙ্গের হলে, তাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ হয়ে যাবে। অথচ ইসলামে এটা হারাম। এমন শতশত শরীয়া বহির্ভুত বিষয়ে প্রোবলেম হয়ে যাবে। এজন্য পালকপ্রথা ইসলামে নেই। আর এ বিষয়টি দুনিয়া থেকে চিরতরে উঠিয়ে দেয়ার জন্যই নবীজির সা. জন্য আল্লাহ তা’আলা যায়নাবকে রা. স্ত্রী বানিয়ে চাক্ষুষ প্রমাণ রেখে দিয়েছেন।

প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনা দিয়ে কয়েকটি বিষয় প্রমাণ হলো,
১. যায়েদ রা. ও আম্মাজান যায়নাব রা. এর বিবাহ বিচ্ছেদে নবীজির সা. কোনো সূত্র ছিলো না, বরং তিনি বিয়েটা টিকিয়ে রাখার জন্য যায়েদ রা. কে পরামর্শ দিয়েছিলেন।
২. যায়নাব রা. এর উপর নবীজির কোনো লোভাতুর নজর ছিলো না।
৩. নবীজির সা. সাথে আম্মাজান যায়নাব রা. এর বিয়েটা সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছিলো।
৪. আম্মাজার যায়নাব রা. নবীজিকে সা. স্বামী হিসাবে পেয়ে যারপরনাই খুশি এবং সুখী ছিলেন।

সুতরাং ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে আম্মাজান যায়নাবের রা. বিয়ে বৈধ এবং উত্তম বিয়ে ছিলো। পাশাপাশি যে নাস্তিকরা পারষ্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ইনসেস্ট,সমকামিতার মত জঘন্য বিষয়গুলোকে বৈধতার রায় দেয়, তাঁরা এরপরেও ঠিক কীসের ভিত্তিতে এই বিয়ে নিয়ে আপত্তি তোলেন, তা আমার বোধগম্য নয়।

Check Also

আয়েশা রা. পর্ব

Leave a Reply

Your email address will not be published.