Home > হিজবুত তাওহীদ > হজ্ব ইবাদত নয়, মুসলিমদের সম্মেলন:

হজ্ব ইবাদত নয়, মুসলিমদের সম্মেলন:

হজ্ব ইবাদত নয়, মুসলিমদের সম্মেলন:

‘হজ্ব’ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যা সামর্থবানদের উপর ফরজ করা হয়েছে। উপরন্তু ইসলামের ৫ স্তম্ভের একটি হলো ‘হজ্ব’। কিন্তু এ বিধানটিকে নিয়ে সময়ের কুফরী মতবাদ হেযবুত তওহীদের দাবিগুলো দেখি।

হেযবুত তওহীদের দাবি:

হজ্বের ব্যাপারে হেযবুত তওহীদের এমাম সেলিম সাহেবের একটি বক্তব্য দেখলাম, যেখানে তিনি বললেন, আমি হজ্ব করতে পারি না? নির্দিষ্ট কয়েক লক্ষ টাকা জমা দিলেই তো হজ্বের পারমিশন পেয়ে যাই। কিন্তু যেদিন এজাতিকে শিরক মুক্ত করতে পারবো সেদিন আল্লাহর ঘর বাইতুল্লাহ’ই যাবো।

উপরন্তু তারা তাদের বইয়ে লিখেছে,

হজ্ব কোন ইবাদত নয়,

‘নামাজ রোজা হজ্ব পূজা প্রার্থনা তীর্থযাত্রা মানুষের মূল এবাদত নয়। মানবজাতী যেন সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে এ লক্ষ্যে নিজেকে উৎসর্গ করাই হচ্ছে প্রকৃত ধর্ম, প্রকৃত এবাদত।’
সূত্র: জঙ্গিবাদ সংকট পৃ:৫৬

হজ্ব হলো মুসলিমদের বাৎসরিক সম্মেলন।

‘মনে রাখতে হবে সেই হজ্ব কিন্তু বিকৃত আকীদার আধ্যাত্মিক সফর বা তীর্থযাত্রা ছিল না, সেটা ছিল উম্মাহর বাৎসরিক মহাসম্মেলন।’
সূত্র: আসুন সিস্টেমটাকেই পাল্টাই-১৪

সুতরাং বুঝা গেলো, হজ্বের মত এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তাদের কাছে মূল্যহীন এক বিধান। যেটা ইবাদত হিসাবে মানতেও তারা নারাজ।

ইসলাম কি বলে?

প্রিয় পাঠক, হজ্ব হলো, ইসলামের ৫ স্তম্ভের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। যা সামর্থবানের উপর আবশ্যকীয় একটি বিধান। হাদিস শরীফে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رضى الله عنهما قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلاَةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ

অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। ১. আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল-এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা। ২. সালাত কায়িম করা। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. হাজ্জ সম্পাদন করা এবং ৫. রমাযানের সিয়ামব্রত পালন করা।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ৮

সুতরাং এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানকারী অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনে মহান রব বলে দিয়েছেন,

وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

অর্থ: আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না
সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭

অর্থাৎ সামর্থবানের জন্য হজ্ব করা আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। উপরন্তু হাদিস শরীফে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ جَاءَ رَجُلٌ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا يُوجِبُ الْحَجَّ قَالَ الزَّادُ وَالرَّاحِلَةُ ‏

অর্থাৎ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরকাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কিসে হজ্জ ফরয হয়? তিনি বললেন, পাথেয় ও বাহন যোগাড়ে সক্ষম হলে।
সূত্র: জামে তিরমিযি, হাদিস: ৮১১

সুতরাং পাথেয় ও বাহনের ব্যবস্থায় রয়েছে, এমন প্রাপ্তবয়স্ক,স্বাধীন, সুস্থ মুসলিমের জন্য হজ্ব আত্যাবশ্যকীয় একটি আমল। ইমাম তিরমিযি রহি. উক্ত হাদিস বর্ণনা করার পর লিখেছে,

وَالْعَمَلُ عَلَيْهِ عِنْدَ أَهْلِ الْعِلْمِ أَنَّ الرَّجُلَ إِذَا مَلَكَ زَادًا وَرَاحِلَةً وَجَبَ عَلَيْهِ الْحَجُّ

অর্থাৎ আলেমগণ এতদনুসারে আমল করেছেন। তাঁরা বলেন, কোন ব্যক্তি যখন পাথেয় ও বাহন যোগাড়ে সক্ষম হয় তখন তার উপর হজ্জ ফরয হয়।

উপরন্তু উপরোল্লেখিত আয়াতকে বুঝাতে গিয়ে হযরত আলী রা. রাসুলুল্লাহ সা. থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন,

عَنْ عَلِيٍّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏مَنْ مَلَكَ زَادًا وَرَاحِلَةً تُبَلِّغُهُ إِلَى بَيْتِ اللَّهِ وَلَمْ يَحُجَّ فَلاَ عَلَيْهِ أَنْ يَمُوتَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا

অর্থাৎ কোন ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’আলার ঘর পর্যন্ত পৌছার মত সম্বল ও বাহনের অধিকারী হওয়ার পরও যদি হাজ্জ না করে তবে সে ইয়াহুদী হয়ে মারা যাক বা নাসারা হয়ে মারা যাক তাতে (আল্লাহ তা’আলার) কোন ভাবনা নেই।
সূত্র: জামে তিরমিযি, হাদিস: ৮১২ মুসনাদে বাযযার: ৮৬১

হযরত আবু উমামা বাহিলী রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন,

من لم تحبِسْه حاجةٌ ظاهرةٌ أو مرضٌ حابسٌ أو سلطانٌ جائرٌ ولم يحُجَّ فلْيمُتْ إن شاء يهوديًّا وإن شاء نصرانيًّا

অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ্য প্রয়োজন বা বাঁধা প্রদানকারী অসুস্থতা বা জালেম সরকারের কারণে (হজ্বে যেতে) প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে, আর এমন অবস্থায়ও যদি (সক্ষম ব্যক্তি) হজ্ব না করেই মারা যায়, সে যেন ইহুদী বা খৃষ্টান হয়ে মারা যায়।
সূত্র: আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব খ. ২ পৃ. ২২ দারেমী: ১৮৭১ সুনানে কুবরা (বাইহাকী) খ. ৪ পৃ. ৪৩৩ মু’জামে আবি ইয়া’লা: ১৩২

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন,

مَن ماتَ ولم يَحُجَّ حجةَ الإسلامِ في غيرِ وجعٍ حابسٍ أو حاجةٍ ظاهرةٍ،أو سلطانٍ جائرٍ، فلْيَمُتْ أيَّ المِيتَتَيْنِ شاءَ إما يهوديًّا أو نصرانيًّا

অর্থাৎ যদি কোনো ব্যক্তি বাঁধা প্রদানকারী অসুস্থতা বা প্রকাশ্য প্রয়োজন বা জালেম সরকারের কারণে (হজ্বে যেতে) প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া ছাড়াই যদি (সক্ষম ব্যক্তি) হজ্ব না করেই মারা যায়, সে যেন দুটোর যেকোনো একটা হয়ে মারা যায়। চাই সে ইহুদী হয়ে মারা যাব বা খৃষ্টান হয়ে।
সূত্র: আত-তালখীসুল হাবির (ইবনে হাজার) খ. ৩ পৃ. ৮৩৬
তাখরীজুল কাশশাফ, খ. ১ পৃ. ২০৩

আল্লামা শাওকানী রহি. বলেন, হাদিসটি হাসান লিগাইরিহি।
সূত্র: নাইলুল আওতার, খ. ৫ পৃ. ৮

কতবড় শক্ত কথা! হজ্ব পরিহারকারী ব্যক্তি কত জঘন্য হলে নবীজি সা. এমন শক্তভাবে বলতে পারেন। উপরন্তু খলীফা উমর রা. বলেনন,

لقد هممتُ أن أبعثَ رجالًا إلى هذِهِ الأمصارِ فلينظُروا كلَّ من كان له جِدَةٌ ولم يَحُجَّ فيضربوا عليهِمُ الجزيَةَ ما هم بِمسلِمينَ ما هم بِمسلِمينَ

অর্থাৎ আমার মন চায় যে, কাউকে এ শহরে পাঠিয়ে দেই, সে যেন হজ্বের সক্ষম ব্যক্তি হজ্ব না করার কারণে তার উপর জিযিয়া আরোপ করে দেয়।  কারণ তারা তো মুসলমান নয়, তারা তো মুসলমান নয়।
সূত্র: দুররে মানসুর (সুয়ুতী রহ.) খ. ৩ পৃ. ৬৯৩

দর্শক যদিও হজ্ব করতে সক্ষম ব্যক্তি হজ্ব না করার কারণে কাফের হয়ে যায় না, কিন্তু একটু ভাবুন তো, উমর রা. কত কঠিন ভাষায় কথাটি বলেছেন। এরপরও কি বলবেন, হজ্ব গুরুত্বহীন একটি আমল?

উপরন্তু হেযবুত তওহীদের ২য় এমাম হুসাইন সেলিম একটি ভিডিওতে বলেছেন, যেদিন সবাই তাওহীদের ডাকে সাড়া দেবে, সেদিন তিনি হজ্ব করবেন।

এক.
প্রথম কথা তো হলো, হজ্ব ফরজ হওয়ার জন্য পাথেয়-বাহন, সুস্থতা এক কথায় সামর্থ থাকা শর্ত, পুরো দুনিয়া শিরক মুক্ত হওয়া শর্ত নয়। যা আমরা কুরআন-হাদিস থেকে উপরে প্রমাণ পেলাম। এরপরও বিশ্ববাসীর শিরক পরিহার করার অপেক্ষা করা বা শর্তারোপ করা চরম মুর্খতা ও ইসলামের নামে চরম অপব্যখ্যা।

দুই.
হাদিসে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. ইন্তেকালের আগেই হজ্ব করেছেন। কিন্তু সে সময় কি পুরোবিশ্ববাসী কালেমার ছায়াতলে এসেছিলো? নিশ্চয় না। যা হেযবুত তওহীদও তাদের বইয়ে লিখেছে,
‘বিশ্বনবি স: তার নবীজীবনের তেইশ বছরে সমস্ত আরব উপদ্বীপে এই শেষ জীবনবিধান প্রতিষ্ঠা করলেন। ইসলামের শেষ সংস্করণ মানব জীবনের একটি অংশে প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু তাঁর দায়ীত্ব সমস্ত পৃথিবী, সমস্ত মানব জাতি।’
সূত্র: বিকৃত সুফিবাদ-৯

তাহলে নবীজি সা. নিজে বিশ্বাবাসীর জন্য অপেক্ষা না করেই হজ্ব করলেন, কিন্তু মহামান্য(?) এমামুযযামান সেলিম সাহেব পারছেন না। এটা কি তার মুর্খতা নাকি ইসলামী বিধানের ব্যাপারে চরম অবজ্ঞা সেটা পাঠক আপনারই ডিসাইড করুন।

হজ্বের ফযিলত:

প্রিয় পাঠক, এসকল ভ্রান্ত লোকের কথায় কান না দিয়ে চলুন সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা হজ্বের বিধান দ্রুত পালন করি। মনে রাখতে হবে হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,

سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ مَنْ حَجَّ للهِ÷ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ

অর্থাৎ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশে হাজ্জ করলো এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ হতে বিরত রইল, সে ঐ দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে হাজ্জ হতে ফিরে আসবে যেদিন তাকে তার মা জন্ম দিয়েছিল।
সূত্র: সহিহ বুখারী, হাদিস: ১৫২১ মুসলিম: ১৩৫০

উপরন্তু সহিহ বুখারীতে হাদিস এসেছে, হযরত আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন,

وأنَّ الحَجَّ يَهْدِمُ ما كانَ قَبْلَهُ

অর্থাৎ হজ্ব ইতিপূর্বের সকল গুনাহ ধ্বংস করে দেয়।
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১

সুতরাং আসুন, হজ্ব নিয়ে হেযবুত তওহীদের এ ভ্রান্ত মতবাদ থেকে সতর্ক হই।

Check Also

উম্মতের বয়স ৬০/৭০ বছর।

প্রিয় পাঠক, আমি আগাগোড়াই বলে আসছি, হেযবুত তওহীদ একটি ভ্রান্ত দল। তাদের এ ভ্রান্তির পেছনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.