সামর্থবানদের জন্য কোরবানী ওয়াজীব না সুন্নাত?

 

প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপরে অর্থাৎ নেসাব পরিমাণ মালের মালিক ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।

১. এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনুল কারীমের ভেতরে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা আদেশ দিয়ে বলে-

فصل لربك وانحر

অর্থাৎ আপনি আপনার রবের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কোরবানী করুন।
সুরা কাউসার-২

এখানে দুটি বিষয়ের আদেশ করা হয়েছে  (১) নামাজ (২) কোরবানি।
এখানে (নামাজ) সালাত শব্দের অর্থ দিয়ে মুফাসসিরীনে কিরাম তিনটি অর্থ করেছেন-

فصل اي الصلاه المكتوبه
فصل اي صلاه الفجر
فصل اي الصلاه يوم النحر

এখানে নামাজ শব্দের অর্থ কেউ বলেছেন-
(১) ফরজ নামাজ
(২) কেউ বলেছেন ফজরের নামাজ
(৩) কেউ বলেছেন কোরবানির দিনের ঈদের নামাজ।
সূত্রঃ তাফসীরে ইবনে কাসীর,তাবারী ইত্যাদী।

সুতরাং এখানে ফরজ নামাজ হোক অথবা ফজরের নামাজ হোক অথবা ঈদের নামাজ হোক,
যেটাই হোক না কেন নামায যে ইসলামে আবশ্যকীয় আমল এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই।
সুতরাং একই আয়াতের দুটি বিষয় অর্থাৎ নামাজ ও কোরবানীর ভেতর একটাকে (নামাজকে) ওয়াজীব বলা আর অরেকটাকে (কোরবানীকে) সুন্নাত বলা (অন্য প্রমান ছাড়া) বৈধ নয়।
সুতরাং সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হলো।

২. প্রসিদ্ধ মুফাসসির আল্লামা কুরতুবী রহ. এবং আল্লামা সানাউল্লাহ পানিপথী রহ. এই আয়াতের অধীনে লিখেছেন,

قال عكرمة وعطاء و قتادة فصل لربك وانحر صلاة العيد يوم النحر ونحر نسكك فعلى هذا يثبت به وجوب صلاة العيد والأضحية

অর্থ: হযরত ইকরিমা, হযরত আতা এবং হযরত কাতাদাহ রহ. বলেন, فصل لربك এর মধ্যে فصل দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ঈদের নামাজ
এবং وانحر দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কুরবানী।
এতে প্রমাণিত হয় যে, ঈদের নামাজ এবং কুরবানী ওয়াজিব।
সূত্র: তাফসীরে মাযহারী খ. ১০ পৃ. ৩৩৭ তাফসীরে কুরতুবী খ: ২০ পৃ: ১৯৫

৩. ইমাম আবূ বকর জাসসাস রহ. এই আয়াতের অধীনে লিখেছেন,

قال الحسن صلاة العيد يوم النحر و نحر البدن … قال أبو بكر هذا التأويل يتضمن معنين أحدهما إيجاب صلاة الأضحى والثاني وجوب الأضحية

অর্থ: হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন,
এই আয়াতে যে فصل لربك দ্বারা নামাজের কথা বলা হয়েছে, তা হচ্ছে ঈদের নামাজ
এবং وانحر দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরবানী।
ইমাম আবু বকর জাসসাস রহ. বলেন, এতে দুটি বিষয় প্রমাণিত হয় ক. ঈদের নামাজ ওয়াজিব খ. কুরবানী করা ওয়াজিব।
সূত্র: আহকামুল কুরআন (জাসসাস) খ. ৩ পৃ. ৪১৯ (সূরা কাওছার এর তাফসীর)।

৪. পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সা. হাদিস শরীফের ভিতরে বলেছেন-

عن مخنف بن سليم قال قال رسول الله صلي الله عليه وسلم على كلِّ أهلِ بيتٍ أُضحيَةٌ

অর্থাৎ মিখনাফ ইবনে সুলাইম রাযিআল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, (প্রতি বছর) প্রত্যেক পরিবারের উপর একটি করে কোরবানী জরুরী।
সূত্রঃ সুনানে আবু দাউদ হাদিস: ২৭৮৮ তিরমিযি-১৫১৮ নাসাঈ-৪২২৪ ইবনে মাযা-৩১২৬
মুসনাদে আহমাদ-২০৭৩১ (হাদিসটির সনদ শক্তিশালী)

এখানে আরবী ইবারতে علي শব্দটি এসেছে যা দ্বারা ওয়াজীব প্রমাণিত হয়। সুতরাং সামর্থবান প্রত্যেকের উপর কোরবানী ওয়াজীব।

বিঃদ্রঃ প্রত্যেক পরিবার বলতে এমন পরিবার যে পরিবারের সকল সম্পদের মালিক হয় একজন।অন্যরা টাকার মালিক থাকেন না। কারণ যে কেউ নেসাব পরিমান টাকার মালিক হয় তার উপরেই কোরবানী ওয়াজীব হয়।

৫. হযরত জুনদুব বিন সুফইয়ান আল বাজালী রাযি. বলেন,

عن جُنْدَبَ بْن سُفْيَانَ الْبَجَلِيّ قَالَ شَهِدْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ النَّحْرِ فَقَالَ مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيُعِدْ مَكَانَهَا أُخْر‘ى وَمَنْ لَمْ يَذْبَحْ فَلْيَذْبَحْ

অর্থ: হযরত জুনদুব ইবনু সুফ্ইয়ান বাজালী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; আমি কুরবানীর দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট হাজির ছিলাম। তিনি বললেনঃ যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের আগে যবহ্ করেছে, সে যেন এর স্থলে আবার যবহ্ করে। আর যে ব্যক্তি যবহ্ করেনি, সে যেন যবহ্ করে নেয়।
সূত্র: সহীহ বুখারী হাদিস: ৫৫৬২

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের নামাজের পূর্বে কুরবানীর পশু জবেহ করার ক্ষেত্রে পুনরায় কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছেন যা এ কথাই প্রমাণ করে যে, কুরবানী একটি ওয়াজিব আমল।

৬. অপর আরেকটি হাদিসে এসেছে-

عن أنس بن مالك قال قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم ومن ذبحَ بعدَ الصَّلاةِ فقد تمَّ نسُكُه، وأصابَ سنَّةَ المسلمينَ

অর্থঃ হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ যে ঈদের নামাজের পরে কোরবানি করল তার কোরবানি সমাপ্ত হল এবং সে মুসলমানদের সুন্নাত অাদায় করল।
সূত্রঃ সহিহ বুখারী হাদিস-৫৫৪৬ মুসলিম-১৯৬২

প্রিয় পাঠক, একটু গভীরভাবে খেয়াল করুন, এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে-
(১) ঈদুল আযহার নামাজ।
(২) পশু জবাহ করা বা কোরবানী করা।
এ দুটোকেই মুসলমানদের সুন্নাত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
মূলত এখানে সুন্নাত অর্থ হচ্ছে “ওয়াজীব”।
কারণ সর্বসম্মতক্রমে ঈদের নামায ওয়াজিব।
অথচ ঈদের নামাজকেও সুন্নাত বলা হয়েছে।
মুলত এখানে মুসলমানদের সুন্নাত অর্থ হলো মুসলমানদের তরীকা বা প্রথা।

এখানে যদি সুন্নাত শব্দ দেখেই কোরবনীকে সুন্নাত বলা হয়, তাহলে ঈদের নামাজকেও সুন্নাত বলতে হবে। অথচ সেটা কেউ বিশ্বাস করে না। সুৎরাং বুঝা গেল ঈদের নামাজ ও কোরবানী করা উভয়টি মুসলিমদের প্রথা অর্থাৎ ওয়াজীব।

৭. উপরন্তু নবীজি সা. যা কন্টিনিউ করতেন, সেটা উম্মতের জন্য ওয়াজীব বা ফরজ হয়ে যেত। হাদিস শরীফে এর প্রমাণ রয়েছে,

عن عائشة أم المؤمنين قالت أنَّ رَسولَ اللَّهِ ﷺ صلَّى ذاتَ ليلةٍ في المَسجدِ، فصلَّى بِصَلاتِه ناسٌ ثُمَّ صلَّى مِن القابِلةِ، فكثُر النَّاسُ، ثُمَّ اجتَمَعوا مِنَ اللَّيلةِ الثَّالثةِ أوِ الرَّابعةِ فلَم يَخرُجْ إليهِم رَسولُ اللهِ ﷺ، فلمَّا أَصبَح قال قد رَأيتُ الَّذي صَنعتُم وَلَم يَمنعْني مِنَ الخُروجِ إليكُم إلَّا أَنَّني خَشيتُ أن تُفرَضَ عَليكُم وذلكَ في رَمضانَ

অর্থঃ হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ এক রজনীতে মসজিদে নামাজ আদায় করলেন এবং রাসূল সাঃ এর নামাজের সাথে সাহাবারও পড়লেন, পরের দিনও আবার নামাজ পড়লেন মানুষও অনেক হয়েছিল। অতপর তৃতীয় রাতে বা চতুর্থ রাতে সাহাবায়ে কেরাম একত্রিত হলেন কিন্তু নবি সঃ এদিন আসলেন না। পরের দিন যখন সকাল হলো, তখন তিনি বললেন, আমি গত রাত্রে তোমাদের আমল দেখেছি, কিন্তু আমি আসিনি। কারণ আমি যদি আজকেও আসতাম তাহলে হয়তো তোমাদের উপরে এটা ফরজ করে দেওয়া হতো।
সূত্রঃ সহিহ বুখারী হাদিস-১১২৯ মুসলিম-৭৬১ আবু দাউদ-১৩৭৩ ইবনে হিব্বান-২৫৪২

উপরোক্ত হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, যে আমলটি রাসূল সঃ নিয়মিত বা কন্টিনিউ করতেন, সে আমলটি সাধারণত উম্মতের উপর ওয়াজিব বা ফরজ করে দেয়া হতো।

এখন আমরা দেখবো কোরবানী কি নবিজি নিয়মিত-কন্টিনিউ করতেন কি না? এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে,

عن عبدالله بن عمر أقامَ رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليهِ وسلَّمَ بالمدينةِ عشرَ سنينَ يُضحِّي

অর্থঃ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় ১০ বছর ছিলেন প্রত্যেক বছরই তিনি কোরবানি করেছেন।
সূত্রঃ সুনানে তিরমিযি হাদিস: ১৫০৭ আহমাদ: ৪৯৫৫

সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে কন্টিনিউ কোরবানির আমলটি করায় এটাই প্রমান করে যে, কোরবানি করা সুন্নাত নয়, বরং ওয়াজীব।

৮. অন্য হাদিসে এসেছে-

عن أبي هريرة قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من كان له سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانًا

অর্থঃ হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাঃ বলেছেনঃ যে ব্যক্তি কোরবানি দিতে সক্ষম কিন্তু দেয়নি সে যেন আমাদের ঈদগাহেও না আসে।
সূত্রঃ জামে সগীর-৮৯০৪ ইবনে মাযা-২১২৩ মুসনাদে আহমাদ-৮২৭৩ অাত-তামহীদ- খ:২৩ পৃ: ১৯০ আল-ইযতিযকার খ:৪ পৃ: ২২৮ (হাদিসটির মানঃ সহিহ।)

قال الزيلعي ومثل هذا الوعيد لا يلحق بترك غير الواجب

অর্থাৎ ইমাম যায়লায়ী রহঃ লিখেছেন,
ওয়াজিব আমল ছেড়ে দেয়া ব্যাতিত এমন ধমক প্রযোজ্য হয় না।

৯. নবীজি সা. এর সাহাবী আনাস রা. থেকে বর্ণিত,

وَقَالَ أَنَسٌ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْحَرُ ثُمَّ يُصَلِّي فَأُمِرَ أَنْ يُصَلِّيَ ثُمَّ يَنْحَرُ

অর্থ: হযরত আনাস রা. বলেন, নবীজি সা. আগে কুরবানী করতেন, পরে নামাজ পড়তেন। অত:পর আদেশ করা হলো, নামাজ পড়ে কুরবানী করতে।
সূত্র: তাফসীরে কুরতুবী খ: ২০ পৃ: ১৯৫

উক্ত হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হলো যে, নবীজি সা. কে ঈদের নামাজ এবং কুরবানী করতে আদেশ করা হয়েছে। আর আদেশ সূচক বাক্য কোনো ক্বরীনা না থাকলে, ফরজ বা ওয়াজীবের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা এটা স্পষ্ট হলো যে, যে ব্যাক্তি নেসাবের মালিক, এমন সবার উপর কোরবানী ওয়াজীব।

লেখক

মুফতী রিজওয়ান রফিকী

পরিচালক: মাদরাসা মারকাযুন নূর বোর্ড বাজার,গাজীপুর সদর।

Check Also

মহিলারা কুরবানীর পশু যবাহ করতে পারবে?

  মুসলিম মহিলারা কুরবানীর পশু যবাহ করতে পারবে। যদি তারা যবাহের নিয়ম ভালোভাবে জানে। তবে …

Leave a Reply

Your email address will not be published.