কালেমা’র অর্থ বিকৃতি

প্রিয় পাঠক! কালিমায়ে তওহীদ তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ ব্যতীত ইবাদাতের উপযুক্ত কেউ নেই। কিন্তু হেযবুত তওহীদের দাবি হলো ‘লা এলাহা এল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত অর্থ- ‘আল্লাহ ছাড়া কোন বিধানদাতা নেই’।

তাদের দাবি হলো, “পৃথিবীর ১৫০ কোটি মুসলমান কাফের। কেন কাফের? সে প্রশ্নের জবাবে তারা বলে থাকেন যে, যে কালেমা পড়ে মুসলিম হতে হয়, এদের সেই কালেমাই তো ঠিক নেই। কারণ যে কথার প্রতি ঈমান আনতে হবে, সে কথায় তারা ঈমান আনয়ন করতে পারেননি। কারণ কালেমার সঠিক অর্থ খৃষ্টানরা বিকৃত করে দিয়েছে অনেক আগেই। আর বর্তমানের নামধারী মুসলিমরা সেই খৃষ্টানদের করা অর্থ গ্রহণ করে নিয়েছে। ফলে বর্তমানের মুসলিমরা বাস্তবে মুসলিম হতে পারেনি।

হেযবুত তওহীদের দাবি:

কালেমার প্রথম বিকৃতি:

হেযবুত তওহীদ তাদের লেখা বইগুলোর ভেতরে অসংখ্য জায়গায় এ বিষয়ে স্পষ্ট করে লিখেছ। নিন্মে তাদের লেখা হুবহু তুলে ধরা হলো,

“তাওহীদের মূল কথা হচ্ছে, এক আল্লাহ ব্যতীত আর কারো হুকুম না মানা।
সূত্র: গঠনতন্ত্র পৃষ্ঠা-১৫

তারা আরো লিখেছেন,

”(ইংরেজদের থেকে কালেমার অর্থ) বদলিয়ে করা হোল আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই। যেটাকে আরবিতে ভাষান্তর কোরলে হয়-লা মা’বুদ এল্লাল্লাহ। এটা করা হোল এই জন্য যে, আল্লাহকে একমাত্র আদেশদাতা হিসাবে নিলে এ জাতিতো ব্রিটিশদের আদেশ মানবে না, মুসলিম থাকতে হোলে আল্লাহর আদেশ মানতে হবে। আর কালেমার মধ্যে “এলাহ” শব্দের অর্থ বদলিয়ে যদি উপাস্য বা মাবুদ শেখানো যায়, তবে এ জাতির লোকজন ব্যক্তিগতভাবে আল্লাহর উপাসনা, নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি নানা উপাসনা কোরতে থাকবে এবং জাতীয় জীবনে ব্রিটিশ প্রভুদের আদেশ পালন কোরতে থাকবে; তাদের অধিকার ও শাসন দৃঢ় ও স্থায়ী হবে। এই উদ্দেশ্যে ঐ বিকৃত এসলামে নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত, আত্মার পরিচ্ছন্নতার জন্য নানারকম ঘষামাজা, আধ্যাত্মিক উন্নতির ওপর গুরুত্ব ও প্রাধান্য দেয়া হোল। কারণ এরা ঐ এবাদত, উপসনা নিয়ে যত বেশী ব্যস্ত থাকবে ব্রিটিশরা তত নিরাপদ হবে।
মূত্র: যামানার এমামের পত্রাবলী পৃ:১০

উক্ত দুটি রেফারেন্স থেকে আমরা জানতে পারলাম এ কথা যে, হেযবুত তওহীদের দাবি হলো,
ক. “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই।
খ. “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” অর্থাৎ “আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই” এটা খ্রীষ্টানদের বানানো ভুল অর্থ।

ইসলাম কি বলে?

প্রিয় পাঠক! পৃথিবীর সমস্ত আরবী ও বাংলা অভিধানে ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ করা হয়েছে ‘মাবুদ’ তথা ইবাদতের উপযুক্ত বা উপাস্য। চলুন এবার দেখি, অভিধানের এ অর্থটি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদিস কি বলে। আমরা জানি, সমস্ত নবি-রাসুলদের দাওয়াতের কালিমা একটি ছিলো তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। এ দাওয়াত দিয়েই সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামকে আ. পাঠিয়েছিলেন আল্লাহ তা’য়ালা। কালেমার ভেতরে থাকা এই “ইলাহ” শব্দের অর্থ মূলত আল্লাহ কি বুঝিয়েছেন একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন।

এ বিষয়টি বুঝতে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। সকলের জানা কথা যে, আগের যুগে ঢালাওভাবে লোকজন মূর্তি পুজা করতো যেমন আজও করে। তবে যারা মুর্তি পুজা করে তারা কিন্তু মূর্তিকে শুধুমাত্র পুজাই করে থাকে, মুর্তির হুকুম বা বিধান কিন্তু তারা কেউ মানে না। কারণ তারাও জানে মুর্তি কোন কথা বলতে পারে না বা মূর্তির নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। সুতরাং যে মুর্তি কথাই বলতে পারে না, সে অবলা মূর্তি বিধান জারি করবে কিভাবে ? সুতরাং মানুষ যেহেতু মূর্তির পূজা বা উপাসনা করতো, সেই মূর্তির পুজা থেকেই উম্মতকে ফিরিয়ে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করার জন্যই মূলত সমস্ত নবিরা আ: আল্লাহর তরফ থেকে দুনিয়ায় এসেছিলেন। সে কথা খোদ আল্লাহ তা’য়ালাই বলেছেন-

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

অর্থ: আর আমি প্রত্যেক জাতির কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাগুতকে পরিহার করো।
সুরা নাহাল আয়াত: ৩৬

উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, সমস্ত নবিগণ আ. স্বীয় গোত্রকে মূর্তির ইবাদত থেকে বিরত থাকতে বলতেন। প্রশ্ন হলো, কি বলে দাওয়াত দিতেন তাঁরা ? সে জবাবও আল্লাহ তা’য়ালা দিয়েছেন-

وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ

অর্থ: আর আপনার পূর্বে আমি যে রাসুলই প্রেরণ করেছি, তার ওপর এই প্রত্যাদেশই করেছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদাত করো।
সুরা আম্বিয়া আয়াত: ২৫

যখন হযরত হুদ আঃ তার কওমকে বলেছিলেন-

وَإِلَى عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ أَفَلَا تَتَّقُونَ

অর্থ: আর আমি আ‘দ জাতির নিকট তাদের ভাই হুদ আ. কে পাঠিয়েছিলাম। সে বললো, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ তথা মাবুদ নেই। তোমরা এখনো সাবধান হবে না?
সুরা আরাফ আয়াত: ৬৫

তখন প্রতিউত্তরে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকজন বলল-

قَالُوا أَجِئْتَنَا لِنَعْبُدَ اللَّهَ وَحْدَهُ وَنَذَرَ مَا كَانَ يَعْبُدُ آبَاؤُنَا

অর্থ: তারা বললো, তুমি কি আমাদের নিকট এ জন্য এসেছো যে, আমরা এক আল্লাহর ইবাদাত করি এবং ত্যাগ করি আমাদের পিতৃপুরুষগণ যার ইবাদাত করতো?
সুরা আরাফ আয়াত: ৭০

মূর্তির এ ইবাদত বা উপাসনা থেকে ফিরানোর ধারবাহিকতায় রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কার কাফিরদের “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”র দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন তারা বলেছিলো:

أَجَعَلَ الْآلِهَةَ إِلَهًا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْءٌ عُجَابٌ

অর্থ: সে কি সকল উপাস্যকে এক উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে? নিশ্চয় এ তো এক আশ্চর্য বিষয়।
সুরা সোয়াদ আয়াত: ৫

প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আয়াত গুলো থেকে আমরা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম যে, সমস্ত নবিগণ আ. মূর্তি পূজায় নিমজ্জিত তাঁদের উম্মাতকে মূর্তির ইবাদত থেকে ফিরাতে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র দাওয়াত দিয়েছেন। কারণ প্রত্যেক নবির আ. উম্মাতেরা মূর্তির বিধান মানতো না, বরং মূর্তির উপাসনা করতো। আর এ কথাটি শুধু আমরা নই, বরং হেযবুত তওহীদও দাবি করে লিখেছে-

“আল্লাহর রাসুল যখন নবুওয়াত লাভ করলেন তখন আরবের অবস্থা ছিল এই যে, জাহেলিয়াতে নিমজ্জিত পশ্চাদপদ একটি জনসংখ্যা, যারা সর্বদা নিজেরা নিজেরা অনৈক্য-সংঘাতে লিপ্ত থাকত, কাঠ পাথরের মূর্তি বানিয়ে পূজা করত,আর হুকুম মান্য করত ঐসব দেব-দেবীর পুরোহিত তথা ধর্মব্যবসায়ী কোরাইশ নেতাদের।”
সূত্র: প্রিয় দেশবাসী পৃ:১১০

প্রিয় পাঠক, এখানে একটু খেয়াল করুন, এখানে ‘ইলাহ’ এর অর্থ যদি করা হয়, “আল্লাহ ছাড়া কোন বিধানদাতা নেই” তাহলে এটা কি কোন সঠিক অর্থ হবে? নিশ্চয় না। কারণ তারা তো করতো মূর্তির ইবাদত, তারা তো মুর্তির বিধান মানতো না। যেহেতু তারা মূর্তি ইবাদত করতো,সেহেতু ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র অর্থ তখনও করা হতো আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ বা উপাস্য নাই। পক্ষান্তরে যদি তখনকার কাফেররা মূর্তির হুকুম মানতো তাহলে, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র অর্থ “আল্লাহ ছাড়া কোন বিধানদাতা নেই” করা যুক্তিসঙ্গত ছিল।

অবশ্য কালেমার অর্থের দাবি এটাও রয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন বিধানদাতা নেই। কিন্তু মূল অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই। এটা আরবীতে নিরক্ষর যারা তারা কিন্তু বুঝাবে না। জেনে রাখা ভালো পন্নী সাহেব কিন্তু আরবীতে নিরক্ষর ছিলেন। এটা আমার কথা নয়, বরং পন্নী সাহেব নিজেই দাবি করে লিখেছেন,

“আমি বাংলা জানি,যেটুকু জানা দরকার মানুষের,ইংলিশ জানি, যতটুকু মানুষের জানা দরকার,আমি আরবী জানি না,আরবীতে আমি নিরক্ষর। ঠিক আক্ষরিকভাবে নয়,কিন্তু আমি আরবী জানি না। আর যে এসলাম নিয়ে কথা সেই এসলাম রোয়েছে কোর’আন-হাদীসে আর সেটার ভাষা আরবী। ওখানে আমি বাস্তবিক অর্থে নিরক্ষর।”
সূত্র: আল্লাহর মো’জেজা হেযবুত তওহীদের বিজয় ঘোষণা-৫৫

সুতরাং পন্নী সাহেব আরবীতে মুর্খতার চরমসীমায় উপনীত থেকে ”কালেমার অর্থ বদলে গেছে” এসব কথা বলে জাতির কাছে নিজেকে হাসির পাত্র বানিয়ে ফেলেছেন।

কালেমার দ্বিতীয় বিকৃতি:

কুফরী মতবাদ এই হেযবুত তওহীদ কালেমার অর্থকে বিকৃত করে “আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নাই” কথাটির তীব্র সমালোচনা করে তারা মূলত মানুষকে সুকৌশলে বেঈমান বানাতে গভীর ষড়যন্ত্রের ছক একেছেন। তাদের মূল টার্গেট হলো, সব ধর্মের লোকদের জান্নাতি সার্টিফিকেট দেয়া। কারণ তাদের কথা হলো, কে কিসের পূজা করছে সেটা ঈমানের মূল বিষয় নয়, বরং আল্লাহকে বিধানদতা  মানলেই সে মুমিন। ইবাদত মূখ্য বিষয় নয়। অবশেষে এ বিকৃতি কোন পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, তাদের নিচের লেখাটা দেখলে আরো স্পষ্ট বুঝবেন। তারা কালেমার অর্থ বিকৃত করতে করতে অবশেষে লিখছেন,

“আমরা নামাজ পড়ছি, মসজিদ নির্মাণ করছি। আমরা হজ্ব করছি, যাকাত দিচ্ছি। এগুলি সব আমল। আমলে পূর্ব শর্ত হচ্ছে। ঈমান কি? লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো হুকুম মানবো না। এর অর্থ কি? এর অর্থ হচ্ছে, যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে যারা ঐক্যবদ্ধ হবেন, তারা হবেন মোমেন। এই মোমেনের নামায-রোযা হজ্ব-যাকাত আল্লাহর কাছে কবুল হবে।”
সূত্র: সূত্রাপুরে এমামের ভাষণ পৃ:৯

প্রিয় পাঠক! কালেমার অর্থ যদি করা হয়, “যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া” তাহলে যেসব নাস্তিকরা ন্যায়ের পক্ষে সারা জিবন সংগ্রাম করে গেছেন, তারাও কি তাহলে মুমিন? তারও কি তওহীদে বিশ্বাসী? তারাও কি মুত্তাকি? আজব হলেও গুজব নয়, এক্ষেত্রে হেযবুত তওহীদের দাবি হলো, হ্যাঁ! তারাও মুত্তাকি! তারা লিখেছেন,

“আল্লাহকে অবিশ্বাসকারী নাস্তিক কমিউনিস্টদের মধ্যেও বহু মানুষ আছেন যারা ন্যায়-অন্যায়, ঠিক-অঠিক দেখে জীবনের পথ চলতে চেষ্টা করেন। তারা মিথ্যা বলেন না, মানুষকে ঠকান না, অন্যের ক্ষতি করেন না, যতটুকু পারেন অন্যের ভালো করেন, গরিবকে সাহায্য করেন ইত্যাদি। তারা মুত্তাকী কিন্তু তারা হেদায়েতে নেই।”
সূত্র: তাকওয়া ও হেদায়াহ পৃ:৭

প্রিয় পাঠক, একটু গভীরভাবে খেয়াল করুন, তাদের দাবি হচ্ছে, যেসব নাস্তিকরা ন্যায়-অন্যায় খেয়াল করে চলেন, তারাও নাকি মুত্তাকি। তারা কালেমার ভুল ব্যাথা দিয়ে নাস্তিকদের মুত্তাকি বানাতে ব্যস্ত থাকলেও মুসলিমদের কাফের বানাতে বদ্ধপরিকর। তাহলে এবার বুঝুন তারা আসলে কারা?

Check Also

দিবস পালন

  ইসলামে দুই ঈদ ব্যাতিত কোনো দিবস পালন করা বৈধ নয়। কিন্তু এ মহাসত্যকে অস্বীকার …

One comment

  1. খুব সুস্পষ্ট দলিল কোর আন শরিফ থেকে যারা বুঝতে চায় তাদের জন্য রয়েছে ভালোবাসা

Leave a Reply

Your email address will not be published.