রোযা অবস্থায় রক্তদান কি জায়েয?

‍রোযা রেখে ব্লাড (রক্ত) দেয়া জায়েয কি না?

রোযা রেখে রক্ত দেয়া জায়েয। তবে ব্যক্তি যদি এমন দুর্বল হয় যে, রক্ত দিলে তাঁর রোযার ক্ষতি হবে বা রোযা ভাঙ্গতে হবে, তবে তার জন্য রক্ত দেয়া মাকরুহ।

হাদিস শরীফে এসেছে,
عن أبي سعيد الخدري قال قال النبي صلي الله عليه وسلم ثلاثٌ لا يُفطرْنَ الصائمَ الحجامةُ والقيءُ والاحتلامُ
অর্থাৎ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা: বলেন, নবিজি স: বলেছেন, তিনটি বস্তুর কারণে রোযা পালনকারীর রোযা ভঙ্গ হবে না। (১) শিঙ্গা লাগালে (২) (অনিচ্ছাকৃতভাবে) বমি হলে (৩) স্বপ্ন দোষ হলে।
সূত্র: তিরমিযি হাদিস-৭১৯ নাসবুর রায়াহ খ:২ পৃ:৪৪৬ দারেকুতনী খ:২ পৃ:১৮৩

عن ابن عباس رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم احتجم وهو محرم واحتجم وهو صائم
অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করিম সা. হজ্বের জন্য ইহরাম বাঁধা অবস্থায় শরীর থেকে শিঙ্গার মাধ্যমে রক্ত বের করেছেন এবং রোজা অবস্থায়ও শরীর থেকে শিঙ্গার মাধ্যমে রক্ত বের করেছেন।
বুখারী হাদিস-১৯৩৮

عن ابي سعيد رضي الله عنه ارخص النبي في الحجامة للصائم
অর্থাৎ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা: বলেন, (শুরুতে তিনি অপছন্দ করলেও) পরবর্তিতে তিনি রোযাদারের জন্য শিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত বের করতে অনুমতি দিয়েছেন।
সূত্র: ফাতহুল বারী খ:৫ পৃ: ৩৩১

عنِ ابنِ عبّاسٍ رَضِي اللَّهُ عنهُما قال إنما الفِطرُ مما دخلَ وليسَ مما خرجَ
অর্থ: হযরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রোযা নষ্ট হয় শরীরে কিছু প্রবেশ করলে, শরীর থেকে কিছু বের হলে নয়।
সূত্র: বায়হাকী হাদিস-৮৫১২ আল মাজমু (নববী) খ:৬ পৃ:৩১৭

উপরোক্ত হাদিস গুলো দ্বারা প্রমাণ হয়, রোযাদারের জন্য শরীর থেকে রক্ত বের করা বৈধ। তবে দুর্বলদের রক্তদান করা জন্য মাকরুহ। হাদিস শরীফে এসেছে,
كان ابن عمر يحتجم وهو صائم في رمضان وغيره ثم تركه لأجل الضعف
অর্থাৎ হযরত জুহরী র: বলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা: রমাযান ও অন্য মাসে রোযা থাকা অবস্থায় তিনি শিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত বের করতেন। কিন্তু পরবর্তিতে দুর্বলতার কারণে এ থেকে বিরত থাকতেন।
সূত্র: ফাতহুল বারী খ:৫ পৃ:৩২৬

عن اصحاب محمد قالوا انما نهي النبي عن الحجامة للصائم للضعيف
অর্থাৎ নবিজি স: এর সাহাবাদের থেকে বর্ণিত তাঁরা বলেন, নবিজি স: দুর্বল ব্যক্তির জন্য শিঙ্গা লাগিয়ে রক্ত বের করতে নিষেধ করেছেন।
সূত্র: ফাতহুল বারী খ:৫ পৃ: ৩৩১

عن ثابت البناني يسأل أنس بن مالك رضي الله عنه أكنتم تكرهون الحجامة للصائم؟. قال لا إلا من أجل الضعف

অর্থাৎ হযরত সাবেত আলবুনানী র: বলেন, হযরত আনাস রা. কে জিজ্ঞাসা করা হল রোযার হালতে শিঙ্গা লাগানোকে কি আপনারা মাকরূহ মনে করতেন? তিনি বলেন, ‘না। তবে এ কারণে দুর্বল হয়ে পড়লে তা মাকরূহ হবে।

সূত্র: বুখারী হাদীস-১৯৪০

অতএব রোযা রাখা অবস্থায় রক্ত দিলে রোযা ভাঙ্গবে না। তবে কেউ যদি শারীরিকভাবে এমন দুর্বল হয় যে, রক্ত দিলে সে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেলবে- তাহলে তার জন্য রক্ত দেওয়া মাকরুহ। –
ফতোয়ায়ে আলমগিরী খ: ১ পৃ: ২০০ আহসানুল ফাতাওয়া খ: ৪ পৃ: ৪৩৫

তবে এখানে একটি কথা না বললেই নয় যে, একজন রোগীকে রক্ত দান করা মানব সেবার অন্তর্ভুক্ত।মানবসেবায় রয়েছে ইসলামের জোরালো আবেদনের পাশাপাশি মহা প্রতিদান। সুতরাং মানবতার সেবায় কেউ যদি রক্ত দেয় তাহলে তার জন্যেও রয়েছে দ্বিগুণ নেকি। মহান আল্লাহ বলেন,
مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا
অর্থাৎ যে কেউ পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা আর অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।
সুরা মায়েদা আয়াত-৩২

উপরন্তু রাসূল সা: বলেছেন,
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال قال النبي صلي الله عليه وسلم مَن نَفَّسَ عن مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِن كُرَبِ الدُّنْيا، نَفَّسَ اللَّهُ عنْه كُرْبَةً مِن كُرَبِ يَومِ القِيامَةِ، وَمَن يَسَّرَ على مُعْسِرٍ، يَسَّرَ اللَّهُ عليه في الدُّنْيا والآخِرَةِ، وَمَن سَتَرَ مُسْلِمًا
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রা: বলেন, নবিজি স: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে ছাড় দেবেন।
সূত্র: মুসলিম হাদিস-২৬৯৯

অতএব রোজা ভেঙ্গে যাওয়ার কোনো প্রকার দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে মানবসেবার তরে রমজান মাসে রক্ত দিতে প্রস্তুত থাকা উচিত। এতে করে রোজার সওয়াবের পাশাপাশি মানবসেবার সওয়াবও পাওয়া যাবে। 

মুফতী রিজওয়ান রফিকী

পরিচালক- মাদরাসা মারকাযুন নূর বোর্ড বাজার,গাজীপুর সদর।

Check Also

ইমাম সাহেবের হুজরায় যেতে পারবে কি না?

إن خرج من غير عذر ساعة فسد اعتكافه অর্থাৎ কোনো প্রয়োজন ছাড়া যদি ইতিকাফকারী ব্যক্তি …

One comment

  1. আল-আমীন

    মাশাআল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published.