নবীজির সা. সৌন্দর্য।

মানুষের সৌন্দর্য দু’রকম। (ক) প্রত্যক্ষ (খ) পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ সৌন্দর্য তো চেহারা আর শরীরের উপর প্রকাশমান থাকে, কিন্তু পরোক্ষ সৌন্দর্য মানুষের আচার-আচরণ ও কর্মে প্রকাশ পায়। আমাদের যুব সমাজ বর্তমানে চেহারার সৌন্দর্য দেখে বলিউড-ঢালিউডের নায়ক-নায়িকাদেরকে মত পোষাক পরতে পছন্দ করে। বিশ্বসুন্দরী মডেলদের পোষাক যেন সব তরুণীদের সেরা চয়েজ। কিরোনমালা,পাখি জামার জন্য তো কত মেয়ে আত্মহত্যা করল! কত সংসার যে ভেঙ্গেছে তার ইয়ত্তা নেই।

যুব সমাজ তো যথানিয়মে সুন্দরী নারীদের প্রেমে সব বিসর্জন দিতে তৈরি। অবস্থা দেখে মমনে হচ্ছে, সুন্দরী নারীদের ক্রাশ খেয়ে ব্রাশফায়ারের সামনে বুক পেতে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না। অথচ এ সৌন্দর্যের মাঝে রয়েছে, হাজারও ধোকা। এখন তো আর কালো মেয়ে দেখা যায় না। মেকাপের ধোকায় যুবকদের চোখ সত্য উপলব্ধিতেও অক্ষম। আয়লানা-মাশকারা, লিপিষ্টিক,টিপ ইত্যাদীর ধাধায় পড়ে যুব সমাজ ধ্বংশের দ্বারপ্রান্তে উপনীত।

হে যুবক, মেকাপ ছাড়া যে নারীরদের চেহারা ফোটে না, আয়লানা-মাশকারা ছাড়া যাদের চোখ সাজে না, লিপিষ্টিক ছাড়া যাদের ঠোট সাজে না। বিয়ে করে এনে দেখছো পুরোটাই কালো। সে মেয়েদের পিছু দৌড়াচ্ছো? অথচ যে যুগে মেকাপ ছিল, না সে যুগের এক মহানায়কের সৌন্দর্য কেমন জানতে চাও? তাহলে শোনো। তাঁর নাম মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ সা.।

তিনি পৃথিবীর সবচে সুন্দর মানুষ ছিলেন।

সাহাবী হযরত আবূ হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

مَا رَأَيْتُ شَيْئًا أَحْسَنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাইতে বেশি সুন্দর কোন জিনিস দেখিনি।
সূত্র: জামে তিরমিয হাদিস: ৩৬৪৮

চাঁদের ন্যায় উজ্জল ছিলেন।

শুধু কি তাই? তিনি ছিলেন, চাঁদের মত উজ্জল। হযরত হিন্দ ইবনে আবি হালা রা. বলেন,

يَتَلَأْلَأُ وَجْهُهُ تَلَأْلُؤَ الْقَمَرِ لَيْلَةَ الْبَدْر

অর্থাৎ নবীজির সা. চেহারা পূর্নিমার চাঁদের মত ঝলমল করতো।
সূত্র: জামে সগীর হাদিস: ৬৪৭৫

হে তরুন, কি ভাবছো? তোমার মাথায় এখন কি কোনো ভিন্ন ভাবনা এসেছে? হয়তো ভাবছো, “ফটো এডিটরের কারসাজি?” না। সে যুগ তো মাল্টিমিডিয়ার যুগ ছিল না। হয়তো ভাবছো, তিনি মেকাপ করে ঘর থেকে বের হতেন! না। সে যুগে মেকাপ তো আবিস্কারও হয়নি। এতটুকু শুনেই চমকে গেলে? তাহলে আরও শোনো,

তিনি চাঁদের চেয়েও সুন্দর ছিলেন,

সাহাবী হযরত জাবের ইবনে সামুরা রা. বলেন,

رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فِي لَيْلَةٍ إِضْحِيَانٍ فَجَعَلْتُ أَنْظُرُ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَإِلَى الْقَمَرِ…..فَإِذَا هُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنَ الْقَمَرِ

অর্থাৎ এক জোছনা রাতে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাকিয়ে দেখলাম……আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে এবং চাঁদের দিকে তাকাতে লাগলাম। তিনিই আমার কাছে চাঁদের চাইতে অধিক সুন্দর মনে হল।
সূত্র: জামে তিরমিযি হাদিস: ২৮১১

শুধু কি তাই? চাঁদের আলো তো সূর্যের চেয়েও কম। তাই না? আচ্ছা যুবক, এ যুগে কারও চেহারা যদি সূর্যের মত উজ্জল হতো তো কেমন হতো? তার সৌন্দর্যের ক্রাশ খেয়ে তো সবাই মাতোয়ারা হতো তাই না? তাহলে চলো তোমার মডেল মুহাম্মাদ সা. এর চেহারা মোবারক কেমন ছিলো? আরেকটু জানি।

নবীজির সা. চেহারা সূর্যের মত আলোকিত ছিল।

. অর্থাৎ হযরত রুবাইয়্যি বিনতে মুয়াওবিয ইবনে আফরা (নামক মহিলা সাহাবী যখন অনেক বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন তার ছেলে একদিন) তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “আচ্ছা মা, আল্লাহর রাসূল দেখতে কেমন ছিলেন?” জবাবে রুবাইয়া বলেছিল

يا بُنيَّ لو رأيتَه لرأيتَ الشَّمسَ طالِعةً

অর্থাৎ বাবা, তুমি যদি তাঁকে দেখতে পেতে, তাহলে মনে করতে এই বুঝি সুর্য উঠেছে!
সূত্র: দারেমী হাদিস: ৬০

২. হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,

كَأَنَّ الشَّمْسَ تَجْرِي فِي وَجْهِهِ

অর্থাৎ যেন সূর্য তার চেহারায় (মুখমণ্ডলে) বিচরণ করছে।
সূত্র: জামে তিরমিযি হাদিস: ৩৬৪৮

সুবহানাল্লাহ! প্রিয় ভাই, তুমি যাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করছো জানো কি তাদের সৌন্দর্যের বাস্তবতা কি? তুমি নিশ্চয় মুভির শুটিং ভিডিও দেখেছো। তোমার প্রিয় মডেল নায়ক-নায়িকা রৌদ্রে যখন শুটিং করে, তখন শুটিং চলা অবস্থায় যদি মুখের উপর ঘামের দানা চলে আসে, তাহলে ভিডিওতে খু্ব বিশ্রী দেখা যাবে বলে মেকাপম্যান দ্রুত এসে টিস্যু দিয়ে মুছে ফের মেকাপ করিয়ে দেয়। এরপর মডেল ক্যামেরার সামনে এ্যালাও হয়। তাহলে বোঝো, তোমার প্রিয় মডেলের মুখে ঘাম কত ঘৃণিত জিনিষ! অথচ আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. এর চেহারায় ঘামের দানা কেমন দেখাতো জানো? নবীজির মেয়ে জামাতা হযরত আলী রা. তাঁর শশুর মুহাম্মাদ সা. সম্পর্কে বলেছেন,

كأنَّ العَرَقَ في وجْهِه اللُّؤلُؤُ

অর্থাৎ নবীজি সা. এর চেহারার উপর ঘাম মুক্তার মত ঝলমল করতো।
সূত্র: তাবাকাতে ইবনে সা’আদ হাদিস: ১০৬২ মাজমাউয যাওয়ায়েদ খ: ৮ পৃ: ২৭৫ তারিখে দিমাশক খ: ৩ পৃ: ২৬২ দালায়েলুন নবুওয়াহ (বাইহাকী) খ: ১ পৃ: ২১৬

ওহে তরুণ, এত সৌন্দর্যময় ব্যক্তিকে মডেল না মেনে কোন মেকাপের সৌন্দর্যের পেছনে দৌড়াচ্ছো? তোমার মডেল রাগ হলে তার চেহারার দিকে তাকালে মনটা খারাপ হয়ে যায়। অথচ আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. কেমন ছিলেন জানো?

রাগ হওয়ার সময় নবীজি সা. চেহারা।

আবদুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের নিকট বের হয়ে এলেন। তখন তাঁরা তাকদীর সম্পর্কে বাদানুবাদ করছিলেন।

فَكَأَنَّمَا يُفْقَأُ فِي وَجْهِهِ حَبُّ الرُّمَّانِ مِنَ الْغَضَبِ

অর্থাৎ ফলে রাগে তাঁর চেহারা লাল বর্ণ ধারণ করে, যেন ডালিমের দানা তাঁর মুখমন্ডলে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে।
সূত্র: সুনান ইবনে মাজাহ হাদিস: ৮৫ মাজমুউ ফাতাওয়া (ইবনে তাইমিয়া রহ.) খ: ২৪ পৃ: ১৭১

কথা বলার সময় নবীজির সৌন্দর্য।

ইবনে আব্বাস রা. বলেন,

كان رسولُ اللهِ إذا تكلَّم رُئِي كالنُّورِ يخرُجُ مِن بَيْنِ ثَناياه

অর্থ: যখন তিনি কথা বলতেন, তখন এই দাঁত মোবারক হতে যেন নূর ঠিকরে পড়তো।
সূত্র: তাবরানী খ: ১ পৃ: ২৩৪

খুশি হওয়ার সময় নবীজির সা. চেহারা।

কা’ব ইবনু মালিক রা. বলেন,

َكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا سُرَّ اسْتَنَارَ وَجْهُهُ حَتَّى كَأَنَّهُ قِطْعَةُ قَمَرٍ

অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল যখন খুশী হতেন তখন তাঁর চেহারা এমন জ্বল-জ্বল করত যেন পূর্ণিমার চাঁদ!”
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ৩৫৫৬

প্রিয় ভাই, একবার কল্পনার জগতে বিচরণ করুন তো। ভাবুন। এমন সৌন্দর্য যে মহামানবের তিনি দেখতে কেমন হতে পারেন? তোমার মডেলের সৌন্দর্য কি আমাদের মডেল মুহাম্মাদ সা. এর সৌন্দর্যের সামনে তুলনাসম হওয়ার যোগ্যতাও রাখে?

কার সৌন্দর্যে (Crush) ক্রাশ খাচ্ছো?

মেকাপের আড়ালে হারিয়ে গেছো তুমিও। কারো সৌন্দর্যে ক্রাশ খেলে একমাত্র মুহাম্মাদ সা. এর সৌন্দর্যে ক্রাশ খাওয়া যুক্তিসংগত। মিশরের মহিলারা ক্রাশ খেয়েছিল ইউসুফ আ. এর সৌন্দর্যে।

জুলাইখা যখন ইউসুফ আ. এর সৌন্দর্যে হারিয়ে গিয়েছিল, ভুলে গিয়েছিল তার আখেরাত, চেয়েছিল অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে এবং এ বিষয়টি যখন ফ্লাশ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক তখন জুলাইখা মিশরের মহিলাদের কানাঘুষা শুনে তাদেরকে ডেকে পাঠাল এবং তাদের জন্যে একটি ভোজ সভার আয়োজন করল। সে তাদের প্রত্যেককে একটি ছুরি দিয়ে বললঃ ইউসুফ, এদের সামনে চলে এস।

فَلَمَّا رَأَيْنَهُ أَكْبَرْنَهُ وَقَطَّعْنَ أَيْدِيَهُنَّ وَقُلْنَ حَاشَ لِلّهِ مَا هَذَا بَشَرًا إِنْ هَذَا إِلاَّ مَلَكٌ كَرِيمٌ

অর্থ: যখন তারা তাকে দেখল, হতভম্ব হয়ে গেল এবং আপন হাত কেটে ফেলল। তারা বললঃ কখনই নয় এ ব্যক্তি মানব নয়। এ তো কোন মহান ফেরেশতা।
সুরাঃ ইউসুফ আয়াত: ৩১

নবীজি সা. ইউসুফ আ. এর সৌন্দর্যের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন,

هُوَ قَدْ أُعْطِيَ شَطْرَ الْحُسْنِ

অর্থাৎ সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাঁকে (ইউসুফ আ. কে)।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ১৬২

প্রিয় ভাই, উক্ত আয়াত এবং হাদিস দ্বারা জানতে পারলাম, কত সুন্দর ছিলেন পায়গম্বর ইউসুফ আ.। কিন্তু আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. এর সৌন্দর্য ছিল ইউসুফ আ. এর দ্বিগুন।

নবীজি সা. এর সৌন্দর্য

ইবনে কায়্যিম রহ. বলেন,

قالت طائفة المراد منه أن يوسف أوتي شطر الحسن الذي أوتيه محمد صلي الله عليه وسلم

অর্থাৎ কিছু উলামায়ে কেরাম বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নবীজি মুহাম্মাদ সা. কে যে সৌন্দর্য দান করা হয়েছিলল তার অর্ধেক সৌন্দর্য দেয়া হয়েছিল ইউসুফ আ. কে।
সূত্র: বাদায়িউল ফাওয়ায়েদ পৃ: ১১৬৭

কথাটি বুঝতে হযরত আনাস রা.এর হাদিসটি খুব সহায়ক হবে।

ما بعث اللَّهُ نَبِيًّا إِلا حَسَنَ الصَّوْتِ حَسَنَ الْوَجْهِ وَكَانَ نَبِيُّكُمْ صلى الله عليه وسلم أَحْسَنَهُمْ وَجْهًا وَأَحْسَنَهُمْ صَوْتًا

অর্থাৎ সকল নবীদেরকে আল্লাহ সবচে সৌন্দর্য এবং সবচে সুন্দর কণ্ঠ দিয়ে পাঠিয়েছেন। তবে তোমাদের নবী তাঁদের চেয়েও সুন্দর কন্ঠ ও সৌন্দর্যের অধিকারী।
সূত্র: ফাতহুল বারী খ: ৭ পৃ: ১৬২

বন্ধু, তোমাকে ডাকছি। বুকে হাত রেখে বলো তো, তোমার মডেল বেশি সুন্দর না আমার মডেল মুহাম্মাদ সা.। নিশ্চয় তুমি বলতে বাধ্য এ কথা যে,
Muhammad s.m is the most beautiful in the world অর্থাৎ মুহাম্মাদ সা. পৃথিবীর সবচে সেরা সুন্দর। তাহলে তোমার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করো তো, তুমি সৃষ্টির সেরা সুন্দর মুহাম্মাদ সা. কে বাদ দিয়ে কিভাবে অন্যকে মডেল হিসাবে গ্রহণ করেছো? কিভাবে পারো তাদের মত চুল স্টাইল করতে? কিভাবে পারো তাদের মত পোষাক পরতে? পারো কেমনে তাদের মত স্টাইল করতে?

আচ্ছা, তোমার কি কখনও একটু স্বপ্ন জাগে না পৃথিবীর সেরা মানুষটির মত ফ্যাশান করতে, তাঁর মত করে চুল কাটতে, তাঁর মত কাপড় পরতে? যদি তুমি সেটা করো তাহলে কি ভুল করবে? নিশ্চয় না। বরং এখন তুমি বড় পিছিয়ে আছো। তোমার মডেল থেকে আমার মডেল মুহাম্মাদ সা. সেরা। অতএব তাঁর মত ফ্যাশান করতে পারা এটা আমার জন্যও বড় গর্বের। লাকাল হামদু ইয়া রব্বানা। আসো। যুবক ভাই, এক সাথে শ্রেষ্ট মানুষটির সেরা পছন্দ গ্রহণ করি, তাঁর রঙ্গে রঙ্গিন হই। কারণ Muhammad s.m is the best model…

Check Also

জান্নাতী হওয়ার আমল তিনটি

হক্বের মানদনণ্ড কি কি? قَدْ جَاءكُم مِّنَ اللّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ সুরা মায়িদা: ১৫ وَمَا …

Leave a Reply

Your email address will not be published.