নবি সা. রহমাতুল্লিল আলামিন নন: হেযবুত তওহীদ।

 

প্রিয় পাঠক! পূর্বেই বলেছি হেযবুত তওহীদের দাবী হলো, “নবি সা. এর দায়ীত্ব ছিলো পুরো পৃথিবীতে দ্বীন ইসলাম কায়েম করা।” যেহেতু তিনি করতে পারেননি সেহেতু তারা বলে থাকেন যে, রাসূল সা. বিশ্বের জন্য রহমত বা রাহমাতুল্লিল আলামিন ছিলেন না এবং তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রাহমাতুল্লিল আলামিন হতেও পারেননি। এমন কি এখনও পর্যন্ত তিনি ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ নন।

হেযবুত তওহীদের দাবি:

নবীজি সা. রহমাতুল্লিল উপাধী কোন কারণে পেয়েছিলেন?

“তিনি আল্লাহ থেকে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের দায়িত্ব ঘোষণা করলেন, আমি আদিষ্ট হয়েছি ততক্ষণ পর্যন্ত স্বশস্ত্র সংগ্রাম (কেতাল) চালিয়ে যেতে, যে পর্যন্ত না প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহকে তাদের একমাত্র এলাহ হিসাবে এবং আমাকে আল্লাহর রসূল হিসাবে মেনে না নেয় (আব্দুল্লাহ এবনে ওমর রা: থেকে বোখারী) সুতরাং এটা সুস্পষ্ট হোল রসুলাল্লাহর দায়িত্ব সমগ্র মানবজাতির উপরে, পুরো মানবজাতির জন্যই তিনি রহমত। তাই তাঁর উপাধিও আল্লাহ দিলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন।
সূত্র: এসলাম শুধু নাম থাকবে পৃষ্ঠা-৯৯।

অর্থাৎ হেযবুত তওহীদের দাবি অনুযায়ী নবীজি সা. কে রহমাতুল্লিল আলামিন উপাধী দেয়া হয়েছিল এ কারণে যে, তিনি যেন সমগ্র মানবজাতিকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল সা. এর উপর ঈমান আনাতে পারেন।

কাফেরদের কারণে তিনি সে উপাধী পাননি:

”বিশ্বনবীর উপর আল্লাহর দেয়া দায়িত্বকে যারা মাঝপথে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন, তারা আল্লাহর দেওয়া বিশ্বনবীর উপাধি, ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ কেও পূর্ণ হতে দেন নি; অর্থাৎ তিনি এখনও ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ হন নি।”
সূত্র: আকিদা পৃ:১৯।

তারা আরও লিখেছেন-

(যদি) পৃথিবী থেকে অন্যায়, অবিচার, যুদ্ধ, রক্তপাত বন্ধ হয়ে পূর্ণ শান্তিতে মানবজাতি বাস করতে পারতো, মালায়েকদের আশংকা মিথ্যা হতো, ইবলিসের মাথা নত হয়ে যেতো, বিশ্বনবীকে আল্লাহর দেয়া রহমাতাল্লিল আলামিন উপাধির অর্থ পূর্ণ হতো।
সূত্র: বিকৃত সুফিবাদ-৪৫ দাজ্জাল-৭৫

সাহাবারাও এ ক্ষেত্রে ব্যার্থ হয়েছেন,

”যতদিন না সমগ্র মানব জাতি নিজেদের তৈরি জীবনব্যবস্থা সমূহ পরিত্যাগ করে মোহাম্মদের মাধ্যমে প্রেরিত আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োগ করবে ততদিন তারা সেই অমান্তি,অন্যায় (ফাসাদ) ও যুদ্ধ,রক্তপাতের (সাফাকুদ্দিমা) মধ্যে ডুবে থাকবে,আজকের মত এবং ততদিন বিশ্বনবীর ঐ উপাধী অর্থবহ হবে না,অর্থপূর্ণ হবে না এবং আজও হয়নি।তাঁর উম্মাহ ব্যর্থ হয়েছে তাঁর উপাধিকে পরিপূর্ণ অর্থবহ করতে।”
সূত্র: আকীদা-২০

অর্থাৎ তাদের দাবী অনুযায়ী পুরো বিশ্বে যেহেতু দ্বীন প্রতিষ্ঠা হয়নি,অতএব নবি মুহাম্মাদ স. এখনও বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বা রহমাতুল্লিল আলামিন হতে পারেননি।

হেযবুত তাওহীদের মাধ্যমেই “রাহমাতাল্লিল আলামিন” উপাধী পূর্ণতা পাবে:

“(হেযবুত তাওহীদের মাধ্যমেই) আল্লাহ রাসুলের নাম “রাহমাতাল্লিল আলামিন” বাস্তবে সার্থকতা লাভ কোরবে।”
সূত্রঃ শোষণের হাতিয়ার পৃষ্ঠা-৬১

ইসলাম কি বলে?

এক.
মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

অর্থ, হে নবী; আমি আপনাকে একমাত্র ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ (উভয় জাহানের রহমত) করেই পাঠিয়েছি।
সূরাঃ আম্বিয়া আয়াত: ১০৭

আয়াতের ব্যাখ্যা:

এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে আল্লামা আবু আব্দুল্লাহ, মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল কুরতুবী রহঃ বলেন-

قَالَ سَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ كَانَ مُحَمَّدٌ ﷺ رَحْمَةً لِجَمِيعِ النَّاسِ

অর্থাৎ হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মাদ সা. সমস্ত মানুষের জন্য রহমত স্বরুপ ছিলেন।
সূত্র: তাফসীরে কুরতুবী খ:১১ পৃ:৩০৫

আরও স্পষ্ট করে অন্যত্র এসেছে-

روى سعيد بن جبير عن ابن عباس قال من آمن بالله ورسوله فله الرحمة فِي الدنيا والآخرة وَمِنَ لم يؤمن بالله ورسوله عوفي أن يصيبه ما كان يصيب الأمم قبل ذلك فهو رحمة للمؤمنين والكافرين

অর্থাৎ: সাঈদ ইবনে যুবায়ের রহঃ হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণনা করেন যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রসুলেন প্রতি ঈমান আনবে নবি সা. তার জন্য দুনিয়া এবং আখেরাতে রহমত স্বরুপ। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আনবে না, তার জন্য পূর্ববর্তী উম্মতের উপর আসা গজবের মত বিপদ থেতে বাঁচিয়ে দেয়া হবে। সে হিসেবে নবি সা. মুমিন এবং কাফের সবার জন্য রহমত স্বরুপ।
সূত্র: তাফসীরে সামারকন্দী খ:২ পৃ:৩৮২

এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে আল্লামা জামাল উদ্দীন, আব্দুর রহমান বিন আলী আল জাওযী আল কুরাইশি রহঃ বলেন,

قوله تعالى ( وما أرسلناكَ إِلا رحمة للعالَمين ) قال ابن عباس هذا عامّ للبَرِّ والفاجر

অর্থ, ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, রাসূল সাঃ এর ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ হওয়াটা নেককার এবং বদকার সকলের জন্যই ব্যাপক।
সূত্র: তাফসীরে জাদুল মায়াসসার: খ: ৪ পৃ:৩৬৫

উক্ত আয়াতে সাধারণ জ্ঞান দিয়ে ভাবলেও স্পষ্ট বুঝে আসবে। মহান আল্লাহ বলেছেন যে, আমি আপনাকে রহমত স্বরুপ পাঠিয়েছি। তার অর্থ কি? অর্থ হলো, আল্লাহ তা’য়ালা নবীজি সা. কে যখন প্রেরণ করেছেন, তিনি তখন থেকেই রহমত।

দুই.
অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন,

لَقَدْ جاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ ما عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُفٌ رَحِيمٌ

অর্থাৎ তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসূল এসেছেন; যিনি, তোমাদের দুঃখ কষ্ট তাঁর কাছে কষ্টদায়ক মনে হয়। সে হচ্ছে তোমাদের খুবই হিতাকাংখী। মোমেনদের প্রতি বড়ই ¯স্নেহশীল ও (রহমত) করুনাময়। (সুরা তাওবা আয়াত ন:১০৭)

প্রিয় পাঠক! খুব মনোযোগ সহকারে দেখুন। আয়াতটি মহান আল্লাহ সাহাবায়ে কেরামকে উদ্দেশ্য করে বলছেন যে, তোমাদের ভেতর যিনি নবি হিসেবে আছেন অর্থাৎ মুহাম্মাদ সা. তিনি মুমিনদের জন্য রহমত স্বরুপ। আয়াতটি তো নবি সা. এর জিবদ্দশায় তাঁর উপরেই অবতীর্ণ হয়েছিল। তখনও মহান রব সাহাবাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে, মুহাম্মাদ সা. তোমাদের জন্য রহমত। অর্থাঃ আমাদের নবী মুহাম্মদ স. জিবদ্দশায়ও ছিলেন ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন।’ এটা সরাসরি রবের তরফ থেকে সুম্পষ্ট প্রমাণিত।

তিন.
পবিত্র হাদিসে এসেছে,

عن أبي هريرة قَال قِيلَ يا رَسُولَ اللهِ ادْعُ على المُشْرِكِينَ قالَ إنِّي لَمْ أُبْعَثْ لَعّانًا وإنَّما بُعِثْتُ رَحْمَةً

অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন নবি স. কে বলা হলো হে আল্লাহর রসুল! আপনি মুশরিকদের ব্যাপারে বদ দোয়া করুন।নবি স. বললেন আমি অভিশাপকারী হিসেবে দুনিয়াতে আসিনি, এসেছি রহমত স্বরুপ।
সূত্র: সহীহ মুসলিম হাদিস-২৫৯৯

প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদিস নিয়ে একটু ভাবলেই স্পষ্ট হবে যে, নবি স. জিবদ্দশায়ও রহমতস্বরুপ ছিলেন। কেননা
ক. তিনি মুশরিকদের জন্য বদদোয়া করেননি এবং বদদোয়া না করার জন্য তিনি কারণ হিসেবে উল্লেখ্য করলেন যে ‘আমি রহমত স্বরুপ এসেছি।’ যদি তিনি তখন রহমত স্বরুপ না থাকতেন, তাহলে তিনি কারণ হিসেবে ”আমি রহমত স্বরুপ” বাক্যটি বলতেন না।
এটা সাধারণ জ্ঞান (common sense) থাকলেও বোঝা যায়।

. নবি সা. বললেন ‘আমি রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি।’ অর্থাৎ নবি সা. প্রেরিত হওয়ার সময় থেকেই রহমত। ইন্তাকালের সময় তো বহু দূর।

চার.
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর কিতাব মুসনদে আহমাদে লম্বা একটি হাদীস বর্ণনা করেন। তার প্রথমাংশ হলো,

عَنْ أَبِى أُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم إنَّ اللهَ بَعَثَني رَحمةً للعالمينَ وهُدًى للعالمينَ

অর্থাৎ হযরত আবু উমামা রাঃ বলেন; রাসুল সাঃ এরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা আমাকে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ করে পাঠিয়েছেন।
সূত্র: মুসনাদে আহমাদ হাদিস-২২৩০৭
তবরানী-৭৮০৩ তয়ালিসি-১২৩০ মুহাল্লা খ:৯ পৃ:৫৯। আবু দাউদ-৪৬৫৯

পাঁচ.
হযরত সালমান রা. রাসূল সা: এর একটি ভাষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

أنَّ رسولَ اللهِ ﷺ خَطَبَ فقال أيُّما رَجُلٍ مِن أُمَّتي سَبَبْتُه سَبَّةً في غَضَبي أو لَعَنْتُه لَعْنةً فإنَّما أنا مِن وَلَدِ آدَمَ أغضَبُ كما يَغْضَبون وإنَّما بَعَثَني رَحمةً للعالَمينَ فاجْعَلْها صلاةً عليه يومَ القِيامةِ

অর্থ, রাসূল সা. তাঁর ভাষণে বলেন, রাগের সময় যদি আমি আমার উম্মতদের কাউকে ভাল-মন্দ বলি অথবা লা’নত করি। তাহলে যেনে রেখ, আমিও আদম সন্তান। আমারও রাগ হতে পারে যেমন তোমরা রাগ কর। তবে আল্লাহ তায়ালা আমাকে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ করে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা যেন আমার এই শব্দগুলোকে (ভালো-মন্দ বলা, লা’নত করা) তাদের জন্য কেয়ামতে রহমতে পরিবর্তন করে দেয়।
সূত্র: আবু দাউদ হাদিস-৪৬৫৯ মুসনাদে আহমাদ-২৩৭০৬

প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদিসে নবি সা. এর দাবির দিকে খেয়াল করুন, রাসূল সাঃ নিজেকে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ বলে দাবি করলেন, তখন তিনি জিবিত অবস্থায়। অতএব হাদিসগুলো থেকে বুঝা গেল নবি সা. ইন্তেকালের বহু আগ থেকেও রহমত।

ছয়.
উপরন্তু নবি সা: বলেন,

عن ذكوان السمان أبي صالح قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يا أيها الناسُ إنما أنا رحمةٌ مُهداةٌ

অর্থাঃ হযরত যাকওয়ান র. বলেন নবি স. বলেছেন-হে মানবজাতি!নিশ্চয় আমি (তোমাদের জন্য) রহমত স্বরুপ, সত্য পথের সন্ধানদাতা।
সূত্র:কানযুল উম্মাল খ:২ পৃ:২৯০ জামে সগীর-২৫৬৮
তারিখুল ইসলাম খ:১ পৃ:৩১ দালায়েলুন নবুওয়াহ খ:১ পৃ:১৫৭

সুতরাং যেখানে সাহাবায়ে কেরামসহ রা: নবি সা. জিবদ্দশায় নিজেকে রহমাতুল্লিল আলামিন বলে দাবি করেছেন এবং নবি স. কে রহমাতুল্লিল আলামিন করে পাঠিয়েছেন বলে স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালাই দাবি করলেন, সেখানে পন্নী সাহেব দাবি করলেন নবি সা. এখনও রহমাতুল্লিল আলামিন হতে পারেননি। কতবড় ধৃষ্টতা! কতবড় সীমালঙ্ঘন! ভাবা যায়?

প্রিয় পাঠক, উপরোল্লিখিত অায়াত এবং হাদিস গুলোয় রাসুলুল্লাহ সা. কে রহমাতুল্লিল আলামিন বলা হয়েছে তখন, যখন ইসলাম পুরো বিশ্বব্যাপী প্রচার হয়নি, পুরো দুনিয়ায় রক্তপাত বন্ধ হয়নি, তারপরও অাল্লাহ তা’য়ালা নবি সা. কে বিশ্ববাসীর জন্য “রহমত” সার্টিফিকেট দিয়েছেন। কিন্তু ১৪’শ বছর পর যখন ইসলাম পৃথিবীর রন্দ্রে রন্দ্রে পৌঁছে গিয়েছে, সেসময় এসে “এখনও নবি সা. ”রহমাতুল্লিল আলামিন” হতে পারেননি” এ কথাটি কি সাহাবায়ে কেরাম রা. ও নবি সা. এবং অাল্লাহ তা’য়ালার অায়াতের সাথে চরমভাবে বিরোধিতা নয়?

অভিযোগ: ১

হেযবুত তওহীদ বিশেষ করে পন্নী সাহেব নবি সা. এখনও ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’ কেন হননি তার কারণ বর্ণনা করেছেন। তাদের দাবি হলো নবি সা. কে সারা দুনিয়ার প্রত্যেকটি মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে। সর্বত্র দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী করে সমস্ত রক্তপাত বন্ধ করার জন্য। অতএবং যতদিন রক্তপাত বন্ধ না হচ্ছে ততদিন তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন হতে পারেন না।

তারা বলছে-
“আজকের মত এবং ততদিন বিশ্বনবীর ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ উপাধী অর্থবহ হবে না, অর্থপূর্ণ হবে না এবং আজও হয়নি।”
সূত্র: আকীদা পৃ:১৯-২০
এসলাম শুধু নাম থাকবে পৃ:৯৯

“তিনি আল্লাহ থেকে আদেশপ্রাপ্ত হয়ে নিজের দায়িত্ব ঘোষণা করলেন, আমি আদিষ্ট হয়েছি ততক্ষণ পর্যন্ত স্বশস্ত্র সংগ্রাম (কেতাল) চালিয়ে যেতে, যে পর্যন্ত না প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহকে তাদের একমাত্র এলাহ হিসাবে এবং আমাকে আল্লাহর রসূল হিসাবে মেনে না নেয় (আব্দুল্লাহ এবনে ওমর রা: থেকে বোখারী) সুতরাং এটা সুস্পষ্ট হোল রসুলাল্লাহর দায়িত্ব সমগ্র মানবজাতির উপরে, পুরো মানবজাতির জন্যই তিনি রহমত। তাই তাঁর উপাধিও আল্লাহ দিলেন রাহমাতাল্লিল আলামিন।”
সূত্র: এসলাম শুধু নাম থাকবে পৃষ্ঠা-৯৯

এখানে তারা বুঝাতে চাচ্ছে যে, নবীজি সা. এর দায়িত্ব ছিল, পুরো বিশ্বের প্রত্যেকটি মানুষ যতক্ষন আল্লাহ তা’য়ালা এবং তাঁর রাসুল সা. কে মেনে না নেবে, ততক্ষণ তরবারীর যুদ্ধ করা। অর্থাৎ বেঈমানরা হয়তো ঈমান আনবে, নইলে নবীজি সা. যুদ্ধের মাধ্যমে সবাইকে শেষ করে দুনিয়াতে যদি শুধু ঈমানদারদের রেখে যেতে পারতেন, তাহলে তিনি রহমাতুল্লিল আলামিন হতে পারতেন। কিন্তু তিনি ইন্তেকালের আগে শুধু আরব ভূ-খন্ডটি এমন করতে পেরেছিলেন, পুরো বিশ্বে পারেননি, সেহেতু তিনি বিশ্বের জন্য রহমত হতে পারেননি।

জবাব:

চলুন প্রথমে তাদের উল্লেখিত হাদিসটি পড়ে নেয়া যাক। সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ‘ওমর রা. হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ

অর্থ: আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
সূত্র: সহিহ বুখারী হাদিস: ২৫

উক্ত হাদিসে বুঝা যাচ্ছে নবীজি সা. পৃথিবীর সমস্ত কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু আদৌ কি বিষয়টি এমন? না। বিষয়টি বুঝতে উক্ত হাদিসটির প্রেক্ষাপট জানতে হবে। কারণ কুরআন শরীফের অনেক আয়াত নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট থাকে, যাকে শানে নুযুল বলা হয়।
ঠিক তেমনি হাদিসেরও প্রেক্ষাপট থাকে। অর্থাৎ রাসুল সা. হাদিসটি বলারও প্রেক্ষাপট থাকে। যাকে “শানে উরুদ” বলা হয়। উক্ত হাদিসটিরও শানে উরুদ রয়েছে।

হাদিসটির শানে উরুদ:

হাদিসটি নবীজি সা. কখন কোন প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, তা নিন্মের হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আগে হাদিসটি পড়ে নেয়া যাক।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ يَوْمَ خَيْبَرَ لأُعْطِيَنَّ هَذِهِ الرَّايَةَ رَجُلاً يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يَفْتَحُ اللَّهُ عَلَى يَدَيْهِ ‏قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ مَا أَحْبَبْتُ الإِمَارَةَ إِلاَّ يَوْمَئِذٍ قَالَ فَتَسَاوَرْتُ لَهَا رَجَاءَ أَنْ أُدْعَى لَهَا قَالَ فَدَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَلِيَّ بْنَ أَبِي طَالِبٍ فَأَعْطَاهُ إِيَّاهَا وَقَالَ ‏امْشِ وَلاَ تَلْتَفِتْ حَتَّى يَفْتَحَ اللَّهُ عَلَيْكَ ‏قَالَ فَسَارَ عَلِيٌّ شَيْئًا ثُمَّ وَقَفَ وَلَمْ يَلْتَفِتْ فَصَرَخَ يَا رَسُولَ اللَّهِ عَلَى مَاذَا أُقَاتِلُ النَّاسَ قَالَ ‏قَاتِلْهُمْ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ فَقَدْ مَنَعُوا مِنْكَ دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلاَّ بِحَقِّهَا وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ

অর্থাৎ হহযরত আবূ হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারের দিন বললেন। নিশ্চয়ই আমি ঐ লোকের হাতে পতাকা তুলে দিবো, যে লোক আল্লাহ ও তার রসূলকে ভালবাসে। তার হাতেই আল্লাহ তা’আলা বিজয় দেবেন। উমর রা. বলেন, শুধু ঐ দিনটি ব্যতীত আমি কখনো নেতৃত্ব লাভের আশা করিনি। এ প্রত্যাশা নিয়ে আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট গেলাম, হয়ত এ কাজের জন্য আমাকে ডাকা হতে পারে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী ইবনু আবূ তালিবকে রা. ডেকে তার হাতে পতাকা দিলেন এবং বললেনঃ অগ্রসর হও, এদিক-ওদিক দৃষ্টি দিও না যতক্ষণ আল্লাহ তোমাকে বিজয় দেন। অতঃপর হযরত ‘আলী রা. সামান্য অগ্রসর হয়ে থামলেন, এদিক-সেদিক দেখেননি।

এরপর চিৎকার করে বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! কোন কথার উপর আমি লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করব। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও যে পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃতপক্ষে আর কোন ইলাহ নেই, আর নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রসূল। যখনই তারা এ সাক্ষ্য প্রদান করবে তখনই তারা তাদের প্রাণ ও ধন-মাল তোমার হাত হতে মুক্ত করে ফেলবে। তবে কোন প্রাপ্য অধিকারের প্রশ্নে মুক্ত হবে না। আর তাদের হিসাব আল্লাহর নিকট।
সূত্র: সহিহ মুসলিম হাদিস: ২৪০৫

প্রিয় পাঠক, আপনিই ভেবে বলুন তো, হাদিসটি কি পৃথিবীর সমস্ত কাফেরদের ব্যাপারে বলা হয়েছিল? নিশ্চয় না। এজন্য হাদিস বিশারদগণ বলেন,

وان المراد بهذا مشركو العرب و اهل الاوثان ومن لا يؤحد وهم كانوا اول من دعي الي الاسلام وقوتل عليه

অর্থাৎ এ হাদিসের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তৎকালীন সময়ের আরবের মুশরিকরা ও মূর্তিপূজারীরা এবং যারা তাওহীদের স্বীকৃতি দেয়নি তারা। কারণ তারাই প্রথম যাদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছিল এবং হত্যা করা হয়েছিল।
সূত্র: উমদাতুল ক্বারী খ: ৮ পৃ: ৩৫৩ আল-আক্বীদা পৃ: ১৭ আল-মিনহাজ খ: ১ পৃ: ২০৭ আল বায়ান ওয়াত তা’রীফ ফি আসবাবি উরুদিল হাদিস পৃ: ১৭২

সুতরাং ইবনে ওমর রা. এর বুখারীর হাদিসের প্রেক্ষাপট না জেনে, হাদিসটির মর্মার্থ না বুঝে “সারা দুনিয়ার কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করে মুসলিম বিশ্ব কায়েম করা নবীজির দায়িত্ব” এমনটা বলা স্পষ্ট মূর্খতা এবং “যেহেতু নবীজি সা. সেটা করে যেতে পারেননি বলে তিনি এখনও রহমাতুল্লিল আলামিন হতে পারেননি” এমনটি বলা কুরআন-হাদিসের সুস্পষ্ট বিরোধিতা।

Check Also

IMG 20210127 150404

ইসলামে বোরখার অস্তিত্ব।

  প্রিয় পাঠক, আমাদের সকলের জানা থাকা দরকার যে, ইসলামের শুরু যুগে পর্দার কোনো বিধানই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *